জীবনের বাঁকে বাঁকে : বসন্ত অভিসারে

February 18, 2018


জীবনের যেখানটায় ফাঁকা
সেখানে তুমি যত্নে বেড়ে উঠছো
প্রতিদিন।

                 -ভাস্কর চক্রবর্তী

কাল মাঝরাতে একঝাঁক জোনাক এসেছে আমার বাড়িতে। ঠিক আমার জানালার ওপারে। নিবু নিবু আলোশিখায় তারা জানাতে এসেছে নতুন একটি অধ্যায়ের গল্প। বসন্ত অধ্যায়। কামিনী ফোটা এই মধু বসন্ত  অকপটে আমাকে করে গেল উদাস। কল্পনাপটে ভেসে উঠল ফেলে আসা দূরের অনেকগুলো বসন্তের  সাদাকালো ছবি। সে ছবির মায়া ঘোরে যখন আমার চোখে নেমে এসেছে এক মুঠো নিদ, ভোরে তখন ঘুম ভেঙেছে বসন্তের  প্রথম চিৎকারে। পুরনো শিউলিতলায় এখনো হেমন্তের পয়লা প্রভাতে ঝরা শিউলি কুড়াতে আসে পাশের বাড়ির বেণী দোলানো ছোট্ট চপলা কিশোরী।

এখনো বসন্ত  আসে। আমি মুগ্ধ হই। তবে আগের মতো এবাড়ি-ওবাড়ি কিংবা আমনধানের মাঠে গিয়ে কৃষকের ধান কাটার আকুলতা দেখি না। ফুলের বনে দুষ্টুবালক হয়ে চষে বেড়াই না মগডালে। এখন আমি জানালার গ্রিল ধরে বসন্তের নীল আকাশ  দেখি আর শ্রীকান্তের আধুনিক গান শুনি। শৈশবের সেই সব বসন্তের  মতো এখনো আমার বোধ, আমার অস্তিত্ব, আমার আমিত্বে এসব বসন্ত অভিসারে  দুলে ওঠে। ভোরের কুয়াশা আমাকে বসন্তের  স্পন্দনে ব্যাকুল করে। গন্ধরাজ ফুলের শুভ্রসফেদ পরাগের হৃদয় হরণকারী সৌরভ এই তরুণ মনকে ডেকে নিয়ে যায় ধানক্ষেতের বাঁকে, যেখানে কৃষাণ ধান কাটে সমবেত কণ্ঠে বেসুরো গান গেয়ে। সেই ধানক্ষেতের এপার-ওপার থেকে ঘাসফড়িংয়ের চঞ্চলতা আর রঙিন প্রজাপতির পাখনা যুগলে যেন অবলীলায় উড়ে বেড়ায় বাসন্তী  বার্তা। দূরের সাদা মেঘের শুভ্র খামে করে কোন সে রাজকন্যা যেন তার কুমার বাবুকে লিখে পাঠাচ্ছে বসন্তের  ছন্দময় কবিতা। কোনো এক ঝরে পড়া পুষ্পমালঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই কুমার বাবু অপেক্ষা করছে রাজকন্যার পাঠানো সেই চিঠির জন্য। হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা সেই কুমার বাবু কি আমি! এসব ভাবতে গিয়ে আমি হয়ে উঠি এক গোপন প্রেমিক, যার প্রেমিকার নাম হবে বাসন্তি। সে বাসন্তী  আমাকে ভীরু স্বরে বলবে ‘এসো, মেতে রই বসন্ত অভিসারে।’

সন্ধ্যা বাড়ির বারান্দায় কিসের এক অচেনা শব্দ আমাকে পাগল করে। আমি চপল চরণে ছুটে যাই সেই শব্দ শ্রবণে। কানে কানে সে শব্দ বাজতে বাজতে আমি ফিরে যাই হারানো শৈশবে। হঠাৎ মনে পড়েÑ এ শব্দ ঝিঁঝিঁ পোকার। বসন্ত এসেছে  বলে ঝিঁঝিঁরাও আহ্লাদে মাতে।

তারপর রাত নামে। রুপালি আকাশে অজস্র তারার হাট বসে। আহা, চোখে নেশা ধরে যায়। ওই কারিগর কিসের অপার সুখে বিশ্বভুবনকে এত অপরূপ করেছেন। ভোরের সোনালি মিঠে কড়া রোদে আবার নতুন করে যখন জেগে ওঠে প্রাণের কিনারে লুকিয়ে থাকা এক ফালি অনুভূতি, তখন আবার বসন্তকে আমি  নতুন করে চিনি। সূর্য ওঠার আগে বকুলতলায় যেতে যেতে শিশির কণা যখন পা দু’খান ভিজিয়ে দেয়, আমার তখন মনে হয় এটাই বুঝি বসন্ত  অভিসার! আহা! 







You Might Also Like

0 comments

Popular Posts