আমাদের গল্পেরা

January 11, 2018


আমাদের গল্পের আজ কোনো ঘর নেই, বাড়ি নেই, আমাদের গল্পের আজ কোনো মধ্যরাত নেই, আমাদের গল্পদের সাথে আজও দেখা হয় নাই আমাদের।

গল্পের সাথে আমার দেখা হয় না। অথচ কী মজার ব্যাপার জানো গল্পকে সাথে নিয়ে ঘুরি, সাইকেলে চাপি, তাকে পেছনে বসাই। গল্প দূর থেকে আমাকে দখল করে নেয়। দখল করার কী দারুন ক্ষমতা তার!
দখল শব্দের মধ্যে একটি নদী নদী ব্যাপার রয়েছে, দখল শব্দের মধ্যে একটি চর চর ব্যাপার রয়েছে। আমাদের গল্পেরাও দখল হয়ে যায়। আরও আরও অক্সিজেন দরকার বন্ধু, রাত এখনো অনেক গভীর।

আমাদের গল্পে বৃষ্টির মতো জ্বিনভূত নেমে আসতো-- আমরা কেঁপে কেঁপে উঠতাম, মাথার উপরে টিনের চালা থাকতো না, আমরা গোল হয়ে আসতাম, আমাদের রক্তে কাঁটা খেলা করে যেতো, আমরা ভয় পেতে পেতে জানালা আটকে দিতাম, মাকে খুব শক্ত করে ধরতাম দুহাত চার পায়ের সমস্ত শক্তি এক করে, খুব শক্ত করে ধরতাম।

আমাদের গল্পে রতনপল্লী ছিল, ছিল না বাহারে দোকান, খোকন দা ছিল, ছিল না কোল্ডড্রিংস্কের বাহার চিকেন পাকোড়া।

আমাদের গল্পেরা অনেক কথার মতো নিজেকে বিক্রি করে ফেলে চাকচিক্যময় দ্যোতনার কাছে, মিথ্যা কোনো লিপস্টিকের বাজারে।

আমাদের গল্পের আজ কোনো ঘর নেই, বাড়ি নেই, আমাদের গল্পের আজ কোনো মধ্যরাত নেই, আমাদের গল্প বের হতে হতে ভেতর ভুলে গেছে।

আমাদের বাড়ির দক্ষিনে ডোবা। আমাদের বাড়ির দক্ষিনে সবুজ আর সবুজ। সবুজে রাতে ডাহুক ডাকে। দিনে সেই ডাহুকই আবার খেলা করে বাচ্চা নিয়ে। দক্ষিনে বসে সবুজ দেখা যায়, ডাহুক দেখা যায়, অনেক বছরের পুরাতন এক কাঁটাগাছ দেখা যায়, দেখা যায় না দূরের সেই গ্রামটিকে।

গ্রামটি আমার শৈশবের প্রশ্ন গল্প কৌতূহল। মনে মনে গ্রামটিতে হাঁটাচলা করে আসি, আমার পায়ে ভর করে সন্ধ্যা নামে। রাত করে বাড়ি ফিরি। মনে মনে। সেই গ্রামে মানুষ থাকে, না ভূত থাকে তাও জানতাম না। জানতে পারবো বলে আশাও করিনি। গ্রামটি তাই আমার কাছে একধরনের আলিফ লায়লা সিরিয়াল-- দেখে দেখে দেখার বাসনা বাড়ে।

সেই দূরের গ্রামের পরপারেও আমাদের জমি ছিল। বাবা গ্রামটি  পার করে প্রায় নিজের জমি দেখতে যেতো। বাবা'কে নিয়ে আমার টেনশনের শেষ ছিল না। কারন ভূত যদি কিছু করে।

আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলাম। গ্রামের ছায়াটিও আমার চোখের সামনে ছোট হয়ে আসতে লাগলো।এখন আর ব্লার করা সেই ছায়া দেখি না, গ্রামটিই কেবল দেখি, গ্রামের ভেতর মানুষের হাঁটাচলা পর্যন্ত দেখি।

এখন আমি অনেক বড়। আর গ্রামটি? গ্রামটি আমার কাছে অনেক ছোট।

ছোট চোখ দিয়ে ডাহুককে যেমন দেখতাম এমনই দেখি, সবুজকে যেমন দেখতাম তেমনি দেখি, একা দাঁড়িয়ে থাকা কাঁটাগাছটিকে এখনো দেখি একা।অনেক অদেখা আস্তে আস্তে দেখা হয়ে যায়, অনেক দেখা কেমন যেন অদেখা থেকে যায়। অনেক অদেখা আবার ভাঁজ করে রাখলে ডোবার পাশের কাঁটাগাছটি হয়ে যায় যে অনেক তেজ নিয়েও বড় বেশি একা।
একা
একা
একা
একা এক অসুখের নাম।

মানুষের ঘর নেই তবুও মানুষ ঘর বানায়, মানুষের কোনো সংবিধান নেই তবুও তারা চায় আইনের শাষন, হরিপদ কালারের টিয়াসুখ মানুষ খুঁজে ধর্মের মতন।
আমি খুঁজে মরি তোমাকে একবার, বারবার-- ফেইসবুক বাতাসে ইথারে ইথারে চোখের ভেতর মনের কথায়-- তুমি নাই তুমি নাই, আবার তোমাকে পাই বিবাহিত তরুলতা ফুলে আষাঢ়ের ঘরে ঘরে পাতায় পাতায়।
অনেক রোদের মতন আমিও মিশে যাবে তোমার রক্তধারায়, ফুটপাত ধরে মানুষ হেঁটে চলে আজন্ম কাল। মানুষ। মানুষ এক বানানো কল্পকাল। তোমার শরীরে আবার জন্মেছে তরুলতা পশু পাখি ফুল, আবার আমি রাখাল হবো, আবার করবো ভুল। এক ভুলে জীবন গেলে অহংকার কোথায় মানব জীবনে! বৃষ্টি আসবে ভেজাবে আমাকে তোমাকে...

ওফেলিয়ার মৃত্যু সহজে মানুষ বিশ্বাস করে, আড়ালে গেলে ঠিক শব্দটি অনেকটা বেঠিক। মাঝির শেষ ঠিকানা ফ্রি টিকিটে পাওয়া যেতে পারে, একেবারে ঠিক দুজন হলে, তিনজনের ভেতরে ঘোলাটে হৃদয়..কারা তবে জলের গায়ে হেঁটে চলে আলোকিত হত্যার ভোরে?
কারা এরা যারা জোয়ারে জোয়ারে নেমে আসে অভিনয় করে পানসে নদীর তীরে?


বাস চলে নৌকা চলে মাংসের গাড়িও পৃথিবীতে চলে। মাংসের গাড়ি অকারনে হুইসেল বাজায়। বাতাস করেছে দখল শব্দের মানুষ-- মালগাড়ি চলে আবাল পিতার, চোখ নিবে গেলে সবুজ ঘাসে কুয়াশা নামে-- গুড মর্নিং মাই ডিয়ার বিকাল। ঘুম এলে শব্দও আসে স্বপ্নে। শব্দ আর দেহ দুটি ঘর মাঝখানে এক উঠোন ব্যবধান।

তোমাদের বাড়ি গিয়ে বলবো আমিও কথা বলতে জানি অলোকানন্দ জলে-- তলে তলে পলিমাটি হারায় আপন দেহ আপনায়, শব্দের নদী মৃতপ্রায় জনান্তিক নীলিমায়, শব্দের দিকে চেয়ে থাকি অকারনে অজানায়। 

You Might Also Like

0 comments

Popular Posts