পোড়ামাটির উঠোন জুড়ে জীর্ণ স্মৃতি

January 04, 2018

পূর্ণিমা রাতের কথা বলবো তোমায়,
বলবো তোমায়
চাঁদ জাগা রাতের কথা,
কৃষ্ণপক্ষের রাত খেয়েছে সে চাঁদ
ওঠে রোজ ভিন্ন আকাশে।

কী এক ইশারা যেন মনে রেখে একা-একা শহরের পথ থেকে পথে
অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে;
তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে:




ধমনীর স্পন্দনের সাথে পেরিয়ে যায় সময়ের সহস্র প্রহর, পোড়ামাটির উঠোন জুড়ে আসে জীর্ণ স্মৃতির শুকনো পাতা। অতন্দ্র বূভূক্ষ হৃদয়ে বীভৎস উষ্ণতার ছোঁয়া এসে দোল খায়, ঘুমন্ত জোনাকির দেহ ঢেকে গেছে গাড় কুয়াশার চাদরে। অনুভূতিগুলো ঘুমিয়ে গেছে শান্ত হয়ে অধীর অপেক্ষা করে,
প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস–দীর্ঘশ্বাস একাকার হয়েছে শূন্যতায়। স্নিগ্ধ প্রভাতের পথে চলতে গিয়ে পূর্ণ হয়েছে হৃদয় রিক্তের বিষাদে, কৃষ্ণকাশের নির্বাণ ধ্রুব তাঁরা দেখা যায় তবু ছোঁয়া যায় না। মৃত নদীর বুকে অদৃশ্য ঢেউয়ের গর্জন শুনতে পায় না কেউ, শুধু অবহেলায় ফোটা কাশফুল ছুয়ে যায় সবাই তীব্র আগ্রহে।

ক্লান্ত তীর্থ যাত্রী বেশে দুঃখ হাটে- সমাগত প্রার্থনার প্রহরে, সুবর্ণ ক্ষণের প্রত্যাশা কেবলই বিস্ময়ের বলয়ে বন্দি। বিচূর্ণ বিচ্ছুরিত আলোর মাঝে মৃত স্বপ্নের লাশের স্তুপ, ক্রুশবিদ্ধ হয়েছে ভালবাসার মানচিত্র, পতাকা আর রোমাল। রক্তাত্ত চিত্তের আর্তনাদ কেবলই গহীনেই বিলীন হয়, ব্যস্ত রাজপথে নেমে আসে না অভিমানী মৌন মিছিল। রক্তের দাগ মুছে আর কতটুকুই বা আড়াল করা যায় ক্ষত, অশ্রুজলে কতটুকুই বা নেভানো যায় ভাঙা বুকের দাবানল। ধর্ষিত সত্ত্বার নগ্নতা দেখে লজ্জিত হই নিজেই নিজের কাছে, বাতাসের উপহাসে ব্যকারনহীন হয় মনের না বলা ভাষা।

মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে শ্মশানের চন্দনকাঠের চিতার গন্ধ
আগুনের — ঘিয়ের ঘ্রাণ;
বিকেলে
অসম্ভব বিষণ্নতা।
ঝাউ হরিতকী শাল, নিভন্ত সূর্যে
পিয়াশাল পিয়াল আমলকী দেবদারু–
বাতাসের বুকে স্পৃহা, উৎসাহ, জীবনের ফেনা;

দ্বৈতস্বত্বার গোপন মিলন দেখেনি কেউ, তবু জানে সবাই, দেহের ধমনী, শিরার গভীর ষড়যন্ত্র আজ উন্মোচিত জনসমক্ষে। এখনও নাকে লেগে থাকা ঘামের গন্ধে হই মাতাল-বেসামাল, বিচলিত হই অতীত-বর্তমানের বিচ্ছেদ রেখার দৃঢ়তায়। ভালবাসা ঘৃণা হয়ে ঘুরে বেড়ায় নিকষ আঁধারে,খাঁ খাঁ রোদে,
লাজ অন্ধ হয়ে চলে প্রকাশ্যে তবুও দ্বন্দ্ব হয় অপরাধবোধের সাথে। মুহূর্তের পর মুহূর্ত চলে কেবলই অভিনব রঙ্গিন মুখোশে, তবু, পিপাসার পেয়ালায় বদলায় না রং, শুধু তৃষ্ণা বেড়েই চলে। অধিকারের আসন জুড়ে এক বিরাট শূন্যতা,হাহাকার স্পন্দন, আশ্রয় খুঁজে খুঁজে নিজেকে বিলীন করাই হয়ত ভালোবাসার মানে। নির্ঘুম বনবাসে এক নীরব অনুভূতি আমাকে আশ্রয় দেয় স্বইচ্ছায়, বিষণ্ণতায় গাড় নীল ছড়িয়ে পড়ে সে তপোবনের আঙ্গিনা জুড়ে।
শীতল অনুভূতি হিম শীতল হয়ে জানিয়ে দেয় বেদনার স্পর্শকাতরতা, জ্যোৎস্না বৃষ্টিতে ভিজে আমি চেয়ে থাকি আকাশের দিকে উদাসী হয়ে। রহস্যের মাকড়শা জাল বুনে বুনে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে আমার পাশে, আমি গভীর প্রেমের আলিঙ্গনে বন্দী করি বাহুডোরে উদার চিত্তে। শুকনো কিছু ঝরা ফুল ভিজে যায় আচমকা এক পশলা বৃষ্টিতে, আমিও ভিজে যাই নিমেষেই তবুও ভেজে না রুক্ষ এ মন এতটুকুও। বেড়ে যায় আঁধারী কষ্টের দৈর্ঘ্য,প্রস্থ, উচ্চতা আর শূন্যতার ওজন, আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যাই, বইতে পারিনা আর এত অসহন ভার।

সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি — এই নদী নক্ষত্রের তলে
সেদিনো দেখিবে স্বপ্ন–সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
আমি চ’লে যাব ব’লে চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে? লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে?
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!




পলাতক প্রশান্তি ফিরে আসে না আর এই অস্থির অশান্ত প্রান্তরে, কেবলই একাকীত্বের নীল গোলাপ ফোঁটায় উর্বর ব্যথিত হৃদয়ে। কালো প্রজাপতির দল এসে ভিড় করে এই নীল গোলাপ কাননে, হুতুম প্যাঁচার বিরহী গানের সুরে মাতোয়ারা এই পোড়া মাটির মদিরা। এক বিন্দু জল,নদী, সাগর, আকাশ আর মহাকাশ বাঁধা পড়ে সুতোয়, আমার এক হাতে সেই মালা অন্য হাতে পুরনো এক পোড়া বাঁশি।
আমি ভারাক্রান্ত সুর তুলি,কিন্তু ধ্বনিত হয় না, শুনতে পায় না কেউ, শুধু শুনতে পায় পোড়া মাটির উঠোনে বসবাসরত কুনো ব্যাঙের দল। গহিনে-গোপনে অনুভূত পরশে এসে দোলা দিয়ে যায় অতৃপ্ত এক সুর, আমি ভুলে যাই বর্তমান, মনে হয় অতীতের মাঝে আমার চির বসবাস।
অভিশাপের আগুনে পুড়তে দেখেছি আমি গোটা পৃথিবীর বক্ষ, তবুও সে আগুন আমি জ্বালাতে পারিনি- নিষ্ঠুর,পাষাণ হয়ে। বারংবার শুধু কেঁপে উঠেছি মনের জ্বলন্ত চিতার তপ্ত আগুনে,
আমি পুড়ে সহেছি, জেনেছি বেঁচে থাকা মানে দগ্ধ যন্ত্রণা। নিষ্ফল আবেদন করেছি বিধাতার কাছে বড় অসহায় হয়ে, তবু বদ্ধ দুয়ার খোলেনি একটিও, আমি শুধুই চেয়ে থেকেছি। ঘর ভেঙ্গে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে থাকে-রুস্থ এক হৃদয়ের উঠোন, ছিঁড়ে যায় প্রণয়ের অভিলাস,অদৃশ্য প্রেমের এক মায়ার বাঁধন।
প্রতারণার আঘাতে ভেঙ্গে চুরে চুরমার হয়েছে অনুভূত এক জগত, প্রিয়ংবদায় পূর্ণ পৃথিবী শূন্য হয়ে পড়ে থাকে শূন্য বক্ষের কুঠিরে।

আর সেই সোনালি চিলের ডানা — ডানা তার আজো কি মাঠের কুয়াশায়
ভেসে আসে; — সেই ন্যাড়া অশ্বত্থের পানে আজও চ’লে যায় সন্ধ্যা
সোনার মত হলে?
ধানের নরম শিষে মেঠো ইঁদুরের চোখ নক্ষত্রের দিকে আজো চায়?
আশ্চর্য বিষ্ময়ে আমি চেয়ে রবো কিছু কাল অন্ধাকার বিছানার কোলে। 




অস্পষ্ট হচ্ছে পৃথিবী-অনুভুত স্বপ্নে মরীচিকা পড়ে পড়ে, দুষ্প্রাপ্য ক্ষুধাবোধ জেগে আবার ডুব দেয় আঁধারের কালো জলে। স্বার্থের অপমৃত্যুতে জীবন হয়েছে আজ অসমভুজের মত, চন্দ্রাভুক অমাবস্যার সুচনা তাই এই অসময়ের অনুপ্রান্তে। সঞ্চারিত হয় স্মৃতির উঠোন জুড়ে ব্যথিত বেদনার ঘোলা জল, কিছু শুকনো স্মৃতির পাতা ভিজে যায় সে জলে, আমি ছুঁয়ে দেখি। নিষ্কলঙ্ক বহুরূপতা আজ আবিস্কার করি কলঙ্কের এক রুপে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে ঘৃণা করি তবু ভেতরে ভালোবাসা পুঞ্জিভূত।
ক্ষণে ক্ষণে ত্যাজ্য করেছি নিজেই নিজের মনকে অসংখ্যবার, তবুও এই মুক্ত কারাগারে বন্দী রয়ে গেছি নিজেরই অজান্তে।  আমি হেঁটে গেছি ধুলোমাখা পথ ধরে তোমার পায়ের চিহ্ন অন্বেষণে, জানি বৃথা সব তবুও সে চলার মাঝে খুঁজে পেয়েছি অজানা তৃপ্তি। চলতে চলতে কখন যেন মাটির সাথে ঘুমিয়ে গেছে নিজের ছায়া,
আমি ডেকেছি বহুবার তবু ঘুম ভাঙ্গেনি,দেয়নি সাড়া একটিবারও। অবান্তর সময়ের হাত ধরে শুধুই আমি চলেছি ফের নিজেকে হারিয়ে, ধূলিধূসর স্মৃতি পড়ে আছে এই ধুলোমাখা সারাটা পথের বুক জুড়ে। নৈহৃত কিমবা ঈশান কোনের বাতাস এসে স্পর্শ করে অনুভূত শরীর,
আচমকা কেঁপে উঠি, নাকে লাগে সেই পরিচিত বাতাসের গন্ধ। ধুলোয় আঁকা আল্পনা এলোমেলো হয়েছে ব্যথিত বাতাসের সঙ্গমে, আজ সে পথে দেখি কেবলই দহন জালা, দগ্ধ দুঃখের স্পষ্ট মানচিত্র।
দ্বিপ্রহরের কাঁধে ভর করে আসে গোধূলি লগন হৃদয়ের ক্ষরিত রঙ্গে, মৃত্যু সাঁতার দেয় সাদা মেঘের দল গোপন ব্যথার নীরব সাথী হয়ে। নিশুতি প্রেমের আলপনা আঁকে মেঘেরা ঢেউয়ে ঢেউয়ে অপূর্ব ঢঙ্গে,
ডিঙ্গি নৌকার বৈঠা হারিয়ে যায় রঙের নরম জলের শুভ্র আবরণে। প্রতিনিয়ত প্রতিস্থাপনের খেলা চলে দুরন্ত মেঘের পরতে পরতে, ধুপ গন্ধহীন টুকরো মেঘেদের রতির সঙ্গী হয়ে থাকে শুধু রঙ। কিছু স্বপ্ন মঙ্গলের অমৃত মৌন বাসনা জেগে ওঠে বিষণ্ণ অনুরোধে, ফের মিলিয়ে যায় নক্ষত্রের অভিশাপে নীলাম্বরী আকাশের নগ্ন বুকে। ব্যবচ্ছেদ হয় পুঞ্জিত স্মৃতির শিরোনাম, বিষাদ আর আর্তনাদের,

চোখ ফেটে জল আসে, বুঝি-আজ অশ্রুদের লুকোনোর জায়গা নেই।

খইরঙা হাঁসটিরে নিয়ে যাবে যেন কোন্‌ কাহিনীর দেশে –
‘পরণ-কথা’র গন্ধ লেগে আছে যেন তার নরম শরীরে,
কল্‌মীদামের থেকে জন্মেছে সে যেন এই পুকুরের নীরে –
নীরবে পা ধোয় জলে একবার — তারপর দূরে নিরুদ্দেশে
চ’লে যায় কুয়াশায় — 

চন্দ্র বিন্দুর নিঃস্বার স্বপ্নচোখ ছড়ায় এখন বিষাদী নীল আন্ধকার, নিঃসৃত সে অন্ধকারে মিশে গেছে নাড়ীর স্পন্দন আর গাড় চুম্বন। এখন অস্পষ্ট স্বরে ভেসে আসে বুক ফাটা আর্তনাদ আর কান্না, হৃদয়ের উঠোনে নেমে আসে ভরা মলিন জ্যোৎস্না স্মৃতির কাতরে। দুঃখের চিত্রকর শুধু দুঃখ আঁকে রাত্রি সুমুদ্দ্রের উত্তাল বুকে জেগে, খেলে জলজ খেলা- জল, রং আর বেদনার মাতাল ঢেউয়ের সংমিশ্রণে। বেদনার্ত জ্যোৎস্না ক্লান্তিহীন কথা বলে সে দুঃখের চিত্রকরের সাথে, নিরবে নিঃশব্দে প্রতিটি নিঃশ্বাসে ফুসফুসের বায়ু কুটরি আন্দোলিত হয়। হৃদপিণ্ডের নিলয় থেকে শিকল ছিড়ে স্মৃতি ছুটে বের হয়ে আসে, নাকের ডগা তির তির করে কেঁপে উঠে ভিজে যায় মস্তিষ্কের বিচলনে।
অস্পষ্ট রঙ্গমঞ্চ আবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভেসে উঠে হাসি মাখা সূর্য, যেন রাত্রি সুমুদ্দ্রের তীরে প্রভাতের- প্রশান্ত,কোমল পুষ্পের বালুচর।
কিন্তু আজ আমার দৃষ্টি বন্দী হয়েছে কালো বেদনার বদ্ধ কারাতে, কোমল প্রভাত আজ বড় অসহ্য, তিক্ত ব্যথার প্রারম্ভিক মনে হয়। চোখের ভাষার ব্যাকরণ ভেঙ্গে সজ্জিত হয়েছে রোষানলের বর্ণে ,
একাকীত্বের নীল কষ্টে ডুবে ডুবে ফের ভেসে উঠি মায়াবী লগনে। উচ্ছ্বাসিত আবেগ গলে পড়ে না আর রোদেলা আলোর বরিষনে, পাথর মনে রোদ এসে প্রতিবিম্ব হয়ে ফিরে যায় তির্যক ভাবে। রুক্ষ চোখের তাঁরায় আজ ভাঙা নূপুরের ছবি আর বিষধর ফণা, স্মৃতির বিষ আজ আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলমান হয়ে আছে।
জীবন সায়াহ্নে দেখি স্মৃতির কাঁটাতার ,সীমান্তে প্রাচীর বেষ্টনী, কাঁদা মাটির শব্দগুলো কিছু ঝুলে আছে কাঁটাতারে অসহায় হয়ে। হৃদয়ের সব লুকোচুরি খেলা শেষ হয় এই সীমান্তে এসে, অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে আসে মুক্তোদানা অশ্রু,বিবর্ণ অবিধান। হাজার ও অভিলাষ পালিয়ে যায় আঁধারে, বিষণ্ণ অবগাহনের আলিঙ্গনে, বহমান দু:স্বপ্নের রাত নিত্য সাথী হয়ে থাকে আমার একাগ্র চিত্তে। পৃথিবীর কোল জুড়ে নিস্তব্ধতা নিয়ে এখন আর রাত নামে না, চারিদিকে কোলাহল, মুখরিত দুঃখ, বেদনার দগ্ধ বিলাপে। মনের অব্যক্ত বাসনা বিলীন হয়েছে নিবিড় মনের সীমান্তেই, মৃত প্রেমের ভাঙ্গা হাড়ে পূর্ণ হয় আজ মনের শ্মশান,অস্ফুট শূন্যতা।
আমার কল্পিত সহস্র আত্মহনন দেখনি তুমি একটি বারও ফিরে, দুরাত্মার সাথে স্বআত্মার দাবি তুমি অগ্রাহ্য করেছ তা বোঝনি। শুধু ভেবেছো উদাস কবির মনের ক্যানভাস কেবলই হেঁয়ালি, রঙতুলিতে এঁকেছি তোমার সমস্ত সত্ত্বা, প্রত্যয়ী প্রেম-তুমি দেখনি। বিলোপিত বেলাভূমির বিবর্ণ বদন চেয়ে থাকে আমার দিকে, বেদনা বিহঙ্গ রুপে বিচরণ করে বর্ণচোরা ভাঙা পাঁজরের আকাশে। আমার পৃথিবী ভেঙেচুরে চুরমার প্রবঞ্চনার প্রলয়ী ঝড়ে, অতৃপ্ত আত্মাকে আহত করে পাশ কাটিয়ে চলে গেছো সন্তর্পণে। অন্ধকার দেয়ালের শেষ প্রান্তে এসে দাড়িয়ে থাকি আমি নির্বিকার, শুধু জীর্ণ স্মৃতিগুলো এসে আমাকে সঙ্গ দেয় আরও নিষ্প্রতিভ করতে।
ব্যঙ্গ করে নিজের ছায়া অসহায় মনের আত্মচিৎকার শুনে, ছাই হয়ে উড়ে যায় অঙ্গিকার আর প্রতিজ্ঞার রূপালী কাগজ। আমি শুধু দেখি অপলক দৃষ্টিতে নীরব,নিথর,অসাড় হয়ে, হাত বাড়াতে পারিনা, আঁকড়ে ধরার চেষ্টা বৃথা হয় বার বার। ব্যথিত আক্ষেপে কেটে যায় সকাল,দুপুর,রঙ্গিন গোধূলি,
স্নিগ্ধ বাতাস রুক্ষ হয়ে ফিরে আসে ভাঙা জানালার চৌকাঠে। আকাশে গোঁত্তা খাওয়া ঘুড়ির মত আজ অস্থির চিত্তের চিত্রা হরিণ, সবুজের চত্বরে ঘুরে ঘুরে-উষ্ণ এক মরুর বুকে এসে দিশেহারা।
চোখে ভাসে শুধু চোরাবালি আর তৃষিত হৃদয়ের ধুক-ধুক-স্পন্দন, তপ্ত রোদ্দুর মাখা উষ্ণ প্রাচীরে হেলান দিয়ে ভাবি একদিন সমুদ্রে ছিলাম।




তোমাদের ব্যস্ত মনে; — তবুও, কিশোর, তুমি নখের আঁচড়ে
যখন এ ঘাস ছিঁড়ে চলে যাবে — যখন মানিকমালা ভোরে
লাল-লাল বটফল কামরাঙা কুড়াতে আসিবে এই পথে–
যখন হলুদ বোঁটা শেফালি কোনো এক নরম শরতে
ঝরিয়ে ঘাসের পরে, — শালিখ খঞ্জনা আজ কতো দূরে ওড়ে–
কতোখানি রোদ-মেঘ — টের পাবে শুয়ে শুয়ে মরণের ঘোরে। 
বজ্রনিনাদে ফিরে পাই চেতন,গুরুগম্ভীর স্বরাগম মেঘে মেঘে, ভিজে যায় শুকনো পাতাগুলো,কিন্তু রক্ত অশ্রুতে নয়,বৃষ্টি ধারায়। তুমি কাঁদনি, কেঁদেছে আকাশ ব্যথিত হয়ে গভীর আবেগে, কেঁদেছি আমিও আকাশের সাথে,তাকে স্নান ভেবেছে সবাই । রাত্রি কেঁদেছে আঁধারে মুখ লুকিয়ে,প্রভাতে তাকে ভেবেছ শিশির , শুধু আমি জানি- সমবেদনার সাতকাহনে সে রজনী ছিল একান্ত সাথী।
পাহাড় কেঁদেছে তাই নেমে এসেছে ঝরনা ধারা,বৃক্ষ ঝরায়েছে পল্লব, সমুদ্রে উঠেছে অশ্রুর প্লাবন, তুমি দেখছ তবু অশ্রু আসেনি ও চোখে। আমার ভাঙা পাঁজর দেখে মৃত্তিকার বুক ফেটে হয়েছে চৌচির, তুমি ভেবেছো চৈত্রের খরতাপে তুচ্ছ ফাটল,আমি দেখেছি তা কষ্টের পরিতাপে।
জীর্ণ স্মৃতির শুকনো পাতাগুলো উড়ে আসে মনের উঠোন জুড়ে, এলোমেলো হয়ে যায় চারিপাশ অরুনন্দিত বাতাসের ঘূর্ণিতে।
ফুটে উঠা কোমল পদ্ম আজ অগ্নি মূর্তির মুখ হয়ে ভেসে ওঠে, আলিঙ্গনের স্মৃতিকথা ভাঙ্গনের রুঢ় কথা হয়ে প্রাণে বাজে। মেঘলা দিন কাটে না আর, নিন্দনীয় শুদ্ধতা মনের স্নিগ্ধতা ভাঙ্গে, জানি প্রত্যাবর্তনও হবে না সুখের তবুও করি নীরব প্রত্যাশা। পরাজয়ের বিস্মরণে আঁখিজল কেবলই কান্না নয় এ যে প্রেম, ফানুসের মত উড়ে যায় স্বপ্ন – অজানা আকাশের ঠিকানায়। বেঁচে থাকার কথা গাঁথা হয় আজ বোবা কান্নার মহাকাব্যে, অন্ধকারাচ্ছন্ন নিঃসঙ্গতায় পথচলা আজ পোড়ামাটির উঠোন জুড়ে।

জানি আত্মাহুতিতে মেলেনা পরিত্রাণ, তাই বেঁচে আছি আজও, কিছু ঋণ এখনও আছে বাকীর খাতায়, লেখা আছে অশ্রু দিয়ে। ঘৃণায় নয় ভালোবাসায় শোধ হবে পুরনো হিসেব-নিকেশ,
আমানত অভিমান আমি ফিরিয়ে দেব তোমার শূন্য বিশ্বাসের ডালিতে, বুকের ক্ষরিত কালো রক্ত দিয়ে আর এক বার সাজাবো তোমায়, হৃদয়ের অভিধানে রাখা শব্দ-কথার মালা পরাবো তোমায় এবার। তুমি দেখতে পাবে তবু স্পর্শ করতে পারবে না মৃত সে সত্ত্বাকে, আরও কয়েক ফোঁটা রক্ত অশ্রু পাওনা আছে তোমার কাছে। এই পোড়া মাটির উঠোনে এসে ফেলে যেয়ো সে অরুণিত জল,
জীর্ণ স্মৃতির শুকনো পাতা আরও একটু ভিজে যাক সে জলে।



You Might Also Like

0 comments

Popular Posts