অনিকেত আস্ফালন

January 08, 2018

জার্মানের রাস্তায়, কলকাতায় কিংবা পুরোনো পল্টনে
একদিন ট্রাফিক জ্যামে তোমার গাড়ির সামনে
এসে দাঁড়াবে এক পাগল...

এলোমেলো চুল-দাড়ি, চামড়ায় শ্যাওলা পোষাক-
যখন দিনের শেষে সকলেই ঘরে ফিরতে চায়
তখন এ পাগলের কোথাও যাওয়ার নেই বলে
তোমার সামনে এসে ওই দ্যাখো...

দেখবে সেখানে আজও
তোমার আঠারো বছর আঁকা আছে।।





ইচ্ছে হলেই লিখে ফেলা যেতো তোমার কানের দুলের দুষ্টুমির কথা, তোমার কালো টিপের নার্ভাসনেস,
লিপিস্টিকের ভিরু ইশারা, নেইল পলিশের বিষন্ন হয়ে যাওয়া, রেশমি চুড়ির হঠাত থমকে যাওয়া,
আচলের বেসামাল উড়াউড়ি। তোমার অনামিকা ঘিরে ছায়াদের ঘুরোঘুরি আর চুলের কালো টিপটার মরচে পড়ে যাওয়ার ইতিবৃত্ত। তোমার নাকের তিলটাকে নিয়ে আমার যে স্বরবৃত্ত।
কিন্তু যেখানটায় লিখবো, সেই তোমার করতলে যে হাটুজল !

তারপর হঠাৎ করেই রাস্তার হলদে নিয়ন বাতিটা কেমন যেন সেই আগের মতো। হাল্কা শীতের বাতাসে কেমন যেন একটা গল্পের গন্ধ; গল্পের নাম নেই, ঠিকানা নেই।
অস্পষ্ট ঘোরে দুলতে থাকে সব-পিচের রাস্তা, সিমেন্টের ফুটপাত সব কিছু। এলোমেলো কথা ভাসতে থাকে বাতাসে। তবু বাতাস শীতল, রাগ করে না মোটেও। পায়ের নীচের ধুলোর মতো শব্দ; গুরুত্বহীন, গন্তব্যহীন। দুপায়ে হেটে চলা- পেন্ডুলামের মতো। অস্তিত্বে অন্তরালে ভাবনা গুলো যেন অবোধ্য প্রলাপ। পায়ের পাতার সাথে তাল মিলিয়ে পালটে যাওয়ার প্রতিযোগীতা যেন।
অনেকদিন অন্ধকার এর শব্দ শুনতে বসে থাকা হয়নি অনেক, অনেকদিন । অনেকদিন সময় কে একটু শান্তি মতো বয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। আধার-নীল এর সাথে গল্প হয়নি; হয়নি উল্টো-পাল্টা শব্দের একসাথে আড্ডা মারা; হঠাৎ করেই হারিয়ে যাওয়া তো প্রায় ভুলতে বসেছে চেতনা। আনমনে বসে থাকা হয়নি, ঘোরের মধ্যে ছুটে চলা হয়নি অনেকদিন।

শব্দ অনেক ছিল কিন্তু কোন বাক্য হল না ...স্বপ্নের মাঝেই জীবন ছিল কিন্তু চোখে ঘুম ছিল না,
যে পথ দিয়ে তোমার চলে যাওয়া সেই পথেই  আমার চেয়ে থাকা……থাকুক না কিছুটা কালো রং আলোর জোছনায় কিছুটা মেঘ, কিছুটা মরচে ধরার আকরিক যন্ত্রনা। চুপচাপ বসে থাকা আর কিছুটা গভীর জলে শ্যাওলা ছায়া। থাকুক না ; অন্যমনস্ক পাতার আড়ালে বাদামী আলো...থরে থরে নেমে আসুক ফোঁটা ফোঁটা সব - তবুও থাকুক নোনা জল পৃথিবীর দ্রাঘিমায়।
একটি মৃতপ্রায় নদীর মোহনায় জেগে উঠা চরে থাকুক না ; কিছুটা বালুতট। থাকুক না কিছুটা কালো রং আলোর জোছনায়....

প্রতিটি ভোর থেকে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত আমি একটা মুখ খুঁজি, যে মুখ আমার,পলাতক সে নাবিকের চেহারা, ব্যর্থ প্রেমিকের করুন মুখের ভাঁজ বেশ্যার কোমরে মুখ লুকোনো পরাজিত পুরুষের অভিব্যক্তি;  গলা ধাক্কা খেয়ে রাজ পথে থাকা মানুষ, কোনো নপুংসুকের নির্লিপ্ত অবয়ব,
এসব চিনে নিতে নিতে আমি খুজে বেড়াই হারানো মুখ, যে মুখ আমার। আয়না দাড়ানো প্রতিবিম্ব,
আমাকে মনে করিয়ে দেয় এ আমি না, আমি না। তুমি এসে যখন বল আমাকেই খুজছো, 'ই' প্রত্যায়ে আমি জানি তুমি আমাকে না, খুজছিলে অন্য কাউকে, হোক সে আমার মত কিংবা তার মত, তাতে তোমার কিছু আসে যায়না। প্রতিটি ভোর থেকে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত আমি একটা মুখ খুঁজি
যে মুখ একান্তই আমার।

বুকের ভেতর খাঁ খাঁ করা হাহাকারটা ...ঝরে যাওয়া নীল নীল স্বপ্নগুলি কুড়িয়ে নিয়ে একাকী ঐ প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার প্রহর সাজিয়ে নিত্যদিন কত গল্পকথা বুনে চলেছি রে... আমি কথা রেখেছিলাম অপেক্ষায় থাকবো... তুই কথা রেখে থামিসনি সেই প্লাটফর্মে...শুধু সিগন্যাল দিয়ে চলে গিয়েছিস নিজ গন্তব্যে ... আমি চুপচাপ ঠায় দাঁড়িয়ে দেখেছি তা...আটকানোর ইচ্ছে হলেও অভিমানে গলা দিয়ে কোন কথাই বের হয়নি..




নগরবাষ্প ভেদ করে যে ললনা কপালে হাত রেখে চোখে স্বপ্ন এঁকে দিতে চায়, চুড়ির রঙ আর টুং টাং দিয়ে যে তৃষ্ণা মেটানোর খেলাটা জানে, ভোরের প্রথম আলোয় আমার অজান্তে যে আমার ক্লান্ত ঘুমেল মুখটা নিজের মতো করে দেখে নেয়, আমার শরীরের ঘ্রাণের অপেক্ষায় যে প্রহর কাটাতে ভালোবাসে, সুখের ছোট ছোট টুকরো আমার বালিশের নিচে গুঁজে অদৃশ্য হয়ে যে আমার কলমে অযাচিত অধিকার বসায়.. সে আমার প্রেমিকা নয়, বউ নয়, কবিতা নয়…
তোমাকে দেখেছি সিটি বাসে -সেদিন দুপুরে…

অন্ধকারের রং কী, জানো? কালো, নিকষ কালো। সেই কালোয় আমার জন্ম, আমার বেড়ে উঠা, আমার বসবাস। আবছা আলোয় অচেনা অবয়ব, মিষ্টি একটা গন্ধ, মনে হল নারী; নারীই হবে...
ছুঁয়ে দেখার সাহস হল ন।। নাম ধরে ডাকলাম; কোনো সাড়া নেই, নিথর নির্বাক পাথরের মূর্তি...
সেই থেকে পাথরের সাথে আমার প্রেম একা জেগে থাকা, একা একা কথা বলা, নিষ্পলক চোখে অপলক চেয়ে থাকা।
কথা ছিলো কষ্টের কবিতা আর লিখবো না, সুদিনের লোভ জাগিয়ে, সুদিন যদি ঘরের দরজায় এসে না দাঁড়ায়, তবে কবিতার কি দোষ...কথা ছিলো অনেকগুলো শিউলি ফুলের মালা পাবো, শিউলিমালা জড়ানো একটি হাত কপালে ঠাঁই নেবে আমার, আমার ফুল যদি আমাকেই ভুলে যায় তবে এ জীবনের কি দোষ...
পাহাড়টা ডিঙ্গিয়ে এক সাথে সমতলে ফেরার কথা ছিলো পাহাড় এলো, সমতল এলো, অশ্রুর সাগর এলো, অন্ধকার এলো, অন্ধকারে হাত নেড়ে যে অতীতকে আমি স্পর্শ করি সেখানে শুধুই ঘন অন্ধকার থাকে, একটি শিউলি ফুলও না...
এ কথা তোমাকে বলে যাওয়া প্রয়োজন, কারন তুমি বোধহয় মনে রাখবে; কথাটা জেনে যাও -
যেদিন আমি চলে যাবো, কেউ মনে রাখবে না এই আমি, কতোখানি ক্ষুদ্র কতোখানি বড় ছিলাম; কতোটুকু উদাস কতোটুকু গভীর, কতোটুকু ভারী কতোটুকু নিস্তেজ, কতোটা পুরু কতোটা পাতলা, কতোটা রুক্ষ কতোটা মসৃন, কতোখানি স্বার্থপর কতোখানি উজবুক, কতোটুকু শীতল আর কতোখানি উষ্ণ ছিলাম।
কেউ মনে রাখবে না আমি কেমন ছিলাম। লোডশেডিং এর অন্ধকারে এ হাত কতোদ্রুত দিয়াশলাই ধরাতো,  ভোরের আলোয় রাত জাগা চুলগোল কতোটা এলোমেলো থাকতো;  হাত বাড়িয়ে এ হাত কতোবার ফিরে এসেছে,কতোবার ঘুম ভেঙ্গেছে ঘুম না ভাঙ্গার ইচ্ছে সত্ত্বেও, কতোবার - কতোবার -কতোখানি - কতোটুকু
এ কথা তোমাকে বলে যাওয়া প্রয়োজন কারন তুমি বোধহয় মনে রাখবে। 



You Might Also Like

0 comments

Popular Posts