দৈত্যের বাগানে শিশু

আমার মানিয়ে নেওয়া অবসরে
বেমানান তুমি লিখেছিললে
"তুই পাগল করতে পারিস এখনো।"নিজের ভেতরেই আছে অলৌকিক। কখনও কখনও তাকে টের পাওয়া যায়। তাই তুমি একবার স্বপ্নে এক জনহীন প্রান্তুরে দাঁড়িয়ে এক নীল অতি সুন্দর বর্নের উড়ন্ত সিংহকে তোমার নিকটবর্তী হতে দেখে ভয় পেয়েছিলে। অথচ ভয়ের কোনো কারন ছিল না, কেন না সেই সিংহের নীল কেশর, নীল চোখ ও নীল নখ সবই হিংস্রতা শূন্য ছিল। এবং সেই নীলবর্নের সিংহের বাসস্থান ছিল না বলে সে অতি নম্র ভাবে তোমার সামনের ভূমি স্পর্শ করে তোমার কাছে একটি বাসস্থানের সন্ধান জানতে চায়, কেননা তুমি এই পৃথিবীর আইনসম্মত বসবাসকারী।

তুমি নিজেও জানোনা কেন তুমি তাকে উপর্যুপরি গুলি করেছিলে। কেন? সেই গুলির শব্দ শুনে এবং আহত ও ক্রুদ্ধ সেই সিংহ তার ক্ষতস্থান কামড়ে ধরে তোমার দিকেই ফিরে তাকাল। তোমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। ঘুম থেকে জাগরনের ভেতর চলে আসবার সময় তুমি যখন এক সুক্ষ্ম বাধাকে অতিক্রম করছিলে তখন তোমার এক অংশ জাগ্রত ছিল, অন্য অংশকে ভয়ে আর্তনাদ করতে শুনেছিলে।
স্বকন্ঠের সেই স্বপ্নাবিষ্ট আর্তনাদ আজও তোমার পাপাবোধকে তাড়িত করে। কিংবা একবার স্বপ্নে তুমি তোমার বন্ধু অতীশকে খুন করেছিলে বলে জাগ্রত অবস্থায় তুমি বহুদিন বিমর্ষ ছিলে। তোমার প্রশ্ন এই যে, স্বপ্নেও কেন তুমি হত্যাকারী?

কিংবা আর একদিন, যেদিন তোমার ছিমছাম শূন্য বাড়িতে অনেকদিন পর মনোরমা এসেছিল। সন্ধ্যে হয়ে গেলেও তুমি আলো জ্বালোনি, আধো অন্ধকারেই সুবিধে ছিল তোমার। মনোরমা অনেক্ষন গ্রামাফোন বাজালো, তারপর "ধ্যুত, কিছু ভালো লাগছে না" বলে পিয়ানোর কাছে উঠে গিয়ে জানালার দিকে পিঠ করে বসল। যদিও সে পিয়ানো বাজাতে জানত না, তবুও ওই জায়গাটা ছিল তার প্রিয়, কেননা ওখান থেকে পুরো ঘরটার দিকে না তাকিয়েও তোমাকে দেখা যায়। তুমি তোমার হেলেনো চেয়ারে পড়েছিলে মনোরমার মুখোমুখি। মনোরমা সারাক্ষন দেখছিল তোমাকে-চোখ না খুলেও টের পাচ্ছিলে তুমি। তুমি কেন তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছ তা জানবার কৌতুহল থাকলেও সে কোনো প্রশ্ন না করেই তা জানতে চেয়েছিল। তুমি কি করে তোমার সেদিনকার হৃদয়হীন কথাবার্তা শুরু করবে তা ভেবে পাচ্ছিলে না। কেন না কথা গুলো বলা হয়ে গেলে মনোরমা চলে যাবে-এই যাওয়াটা তাঁর পক্ষে কতটা অপমানকর তা ভেবে মনে মনে বড় কষ্ট পাচ্ছিলে তুমি। তুমি একপলক চোখ খুলে দেখলে সে অন্যমনষ্ক দৃষ্টিতে আলমারীতে সাজানো খেলাধুলোয় পাওয়া তোমার ট্রফিগুলো দেখছে। পরমুহুর্তেই উঠে গেল সে ছায়ার মত বইয়ের র‍্যাকের কাছে, টেলিফোনের কাছে, ড্রেসিং টেবিলের কাছে পরপর দেখা গেল তাকে। আবছা গলা শোনা গেল তাঁর "তুমি কি ভীষন চরিত্রহীন সুমন!" তুমি ভেবে পেলেনা-ও কি করছে। কিন্তু সুযোগ বুঝে তুমি বলতে শুরু করেছিলে ' শোনো মনোরমা...'মনোরমার ছায়াকে আবার পিয়ানোর কাছে দেখা গেল। তুমি আবার বললে, 'শোনো মনোরমা...'  পরমুহুর্তে মাথা নিচু করল মনোরমা, তাঁর ডানহাত কোলের উপর থেকে শাড়ির আঁচল তুলে নিলে তুমি অতর্কিতে বুঝতে পারলে মনোরমা কাঁদছে। তুমি তাড়াতাড়ি উঠতে যাচ্ছিলে, তুমি কিছু বলবার চেষ্টা করছিলে, কিন্তু তাঁর আগেই কান্নার ঝোঁকে ভর রাখতে গিয়েই মনোরমা বাঁ হাত বাড়িয়ে পিয়ানোর এলোমেলো রিডগুলি ছুঁয়ে গেলে তুমি তড়িতদাহের মত স্থির হয়ে গেলে। ধীর গম্ভীর স্বরে সেই পিয়ানো তোমাকে চুপ করতে বলল। তুমি আর একবার উঠবার চেষ্টা করলে। পিয়ানো গর্জন করে উঠল। যেন মনোরমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে ডালা খোলা প্রকান্ড সেই অন্ধকার পিয়ানো তোমার উপর লাফিয়ে পড়বে। তুমি আবার মনরমার স্বর শুনতে পেলে, " সুমন, তুমি চরিত্রহীন-"
স্থলিতকন্ঠে তুমি আবার মনোরমার নাম ধরে ডাকলে। ঠিক সেই সময়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ভারসাম্য রক্ষার জন্য মনোরমা আবার পিয়ানোর রিডে হাত রেখেছিল, তাঁর অশিক্ষিত অপটু হাতে পিয়ানো তীব্রভাবে বেজে উঠলে ঘরের সবকিছু প্রান পেয়ে গেল। অর্থহীন শ্বেতপাথরের টেবিল, টেলিফোন, ওয়ার্ডরোব এ সব কিছুই তোমার উপর লাফিয়ে পড়বে-তোমার মনে হল। তীব্র এবং অলৌকিক ভয় থেকে তুমি দেখলে এ ঘরের সব কিছুই মনোরমার। তোমার ট্রফিগুলো, হেলানো চেয়ার, গ্রামাফোন বইয়ের র‍্যাক সবকিছুই মনোরমার, তুমি আগন্তুক মাত্র। মুহুর্তেই হাঁটু গেড়ে এই কথা বলার অলৌকীক ইচ্ছা হয়েছিল তোমার যে "ক্ষমা করো"
তুমি নড়তে পারলে না।
মনোরমা তড়িতগতিতে তাঁর ব্যাগ কুড়িয়ে নিল, তুমি তাঁর আধাভাঙ্গা কথা শুনতে পেলে, "আমি সব জানি, কিন্তু তুমি কখনও বলো না সুমন...বোলো না..."

পিয়ানোর ভেতর অলৌকীক বলে কিছু নেই, কিন্তু কোথাও ছিল সেই ঘরে, অন্ধকারে, তোমার স্পর্শকাতরতার ভেতরে পিয়ানোর সেই অচেনা নোট -মনোরমা না জেনে কয়েক মুহুর্তের জন্যে সেইখানে তার হাত রেখেছিল।



Powered by Blogger.