ছেলেবেলার স্বপ্ন

October 23, 2017

ছেলেবেলায় খুব ঘুড়ি ওড়াবার সখ ছিল। বিশ্বকর্মা পূজার দিনটাকে মনে হত বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। দিগন্ত থেকে একটা কাঁটা ঘুড়ি উড়তে উড়তে এসে যদি আমারই ছাদে পড়ত - তবে তাঁর চেয়ে বড় উল্লাস আর কিছুতে বোধ করিনি। আকাশের একটা বদ অভ্যেস আছে, ঠিক বিশ্বকর্মা পূজার দিন একবার অন্তত বৃষ্টি ঝরানো। এ জন্য আকাশের দেবতাকে কত অভিশাপ দিয়েছি।

খুবই নীচের ক্লাসে তখন পড়ি, একটা রচনা এসেছিল- ' তোমাকে যদি একহাজার টাকা দেওয়া হয়, তুমি কি করবে? ' 
অন্য ছেলেরা খুব বুদ্ধিমান, তারা কেউ লিখলো ভিখিরিদের খাওয়াবে, কেউ লিখল নাইট স্কুল স্থাপন করবে। এমন কি একজন লিখেছিল যে, গ্রামে গ্রামে গিয়ে টিউবওয়েল বসিয়ে দিয়ে আসবে। 
আমি লিখেছিলুম, " আমি ঘুড়ির দোকান করিব, এবং কম দামে ঘুড়ি বিক্রয় করিব।" 
পরোপকারের চেয়ে বড়ো উপায় আমার জানা ছিল না। নাজির হোসেনের ঘুড়ির দোকানের সামনে আমি কতদিন করুন চোখে তাকিয়ে থেকেছি। কাল রঙা কড়ি চাদিয়ালের জন্য আমার অসম্ভব লোভ ছিল।
মাস্টারমশাই আমার রচনা পড়ে কান মুলে দিয়ে বলেছিলেন, ঘুড়ির দোকান? তোর দ্বারা ওর চেয়ে বেশি কিছু আর হবেও না জীবনে।

তারপর সত্যি সত্যিই কলেজ টলেজ ছেড়ে এসে বয়েসে বড় হয়েছি, কিন্তু আর কিছুই হইনি। কোথাও যেন একটা ভুল হয়ে গেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দুর্বোধ্য অনর্থক মনে হয়। যারা বারবার স্বপ্ন বদলায়, তারাই ভুল করে বোধহয়।

ছেলেবেলায় যাকে দেখেছি, তখন থেকেই ঠিক করে রেখেছে ডাক্তার হবে, সে ডাক্তারই হয়েছে। আর কিছু হতেও চায় নি। বাবলু ডাক্তার হতে চেয়েছিল। ডাক্তার হয়ে বাব্লু সত্যিই খুশি। মুরারীর ইচ্ছা ছিল লেখক হবে। ক্লাস টেনে থাকতেই মুরারী দুটি নাটক লিখে ফেলে সগর্বে ঘোষনা করেছিল, দেখিস, বড় হয়ে একদিন আমি রাইটার হব। আমি ভক্তের মত মুরারীর দিকে তাকিয়ে থাকতুম। মুরারী এখন বড় অফিসার, যথেষ্ট ডিএ বাড়ছে না, এই তাঁর দুঃখ।
আমার স্পষ্ট মনে আছে ইতিহাস ক্লাসে সুবিমল বলেছিল বড় হয়ে ও নান দেশ ঘুড়ে বেড়াবে। সুবিমলের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয়। একটা ওষুধ কোম্পানি সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ। প্রায়ই দূরে নানান যায়গায় যেতে হয়। দেখা হলেই বলি, কি রে কেমন আছিস? চলি, বড় ব্যস্ত আছি। সন্ধ্যেবেলা দিল্লি এক্সপ্রেস ধরতে হবে।

কখনো কখনো খুব অদ্ভুত লাগে। জানালার সামনে ঠক করে একটা কালো চাদিয়াল ঘুড়ি এসে পড়লো। আগে এইরকম ঘুড়ি দেখলে বুকের মাঝে দুপ দাপ করতো। আজ আমি একটু উঠে হাত বাড়ালেই ওটাকে ধরতে পারি। কিন্তু কোনো ইচ্ছেই হল না। দূর থেকে কতকগুলো ছেলে ওটাকে নেবার জন্য ছুটে আসছে। আমি হাঁসি মুখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছি। যে ছেলেটা সবথেকে আগে ছুটে আসছে, ওর মুখটা অনেকটা আমারই ছেলেবেলার মুখের মতন দেখতে না।

ছেলেবেলার এসব স্বপ্ন গুলো কোথায় যায়? ছেলেবেলায় ভাবতুম, বড় হয়ে শুধু অফিসে চাকরি করা, সংসার পেতে বাড়ি বানানো, এই শুধু জীবন নাকি? আসল জীবন অন্যরকম। কি রকম ঠিক জানি না। কিন্তু অন্য রকম। বড় হওয়া টড় হওয়া সব বাজে কথা, কোনোরকমে জীবনটা টিকিয়ে রাখাই বড় কথা। 

You Might Also Like

0 comments

Popular Posts