21 April 2017

চিঠিকে খোলা চিঠি

প্রিয় চিঠি,

“..তুমি আমি পুতুল খেলব। নকশালদের ডেরা খুঁজবো। নকশালবাজি করব। ছায়াপথে হাত ধরে হাঁটব। তুমি রাজি তো? …”

সেই কবে কেউ লিখেছিল। লাল কালিতে। সে পাতার বয়স হয়েছে। তবু যত্নে রাখা বইয়ের ফাঁকে। আজও। সে নেই, চিঠিটা আছে। এখনও।

ইনল্যান্ড লেটারের আকাশি রঙে কেউ নীল কালিতে লিখেছিল কবে,

আমার বাড়ি এলে তোকে আমি অমলতাস ফুল দেখাব। সন্ধ্যেবেলা বড় ছাদটা সুপুরি গাছের ছায়ায় ভারী সুন্দর লাগে, দেখতে পাবি। স্বর্ণচাঁপা গাছে, শিউলি গাছে, মাধবীলতা গাছে জ্যোৎস্না আটকে থাকে, দেখবি…”

সে বাড়িতে আর যাওয়া হয় না। তবু চিঠি থেকে গেছে।

চিঠি, এভাবেই তোকে আমি রেখে দিয়েছি আমার লুকোনো বাক্সে। যত্নে, আড়ালে। তোর বাক্সে আর ভিড় বাড়ে না। আর কেউ চিঠি লেখে না আমায়। আমারও লেখা হয় না কাউকে। চিঠি, তোকে আদর করতে ভুলে গেছি বহুদিন।

কারোর মনে একরাশ অভিমান ছিল। জমতে জমতে বোঝা হয়ে যাওয়ার আগে লিখে ফেলেছিল তোর বুকে। বিদেশ বিভুঁইয়ে পড়ে থাকা কেউ একদিন, আলস দুপুরে পেয়েছিল কারোর মৃত্যু সংবাদ। অথবা কেউ তোকে পড়তে পড়তেই জেনে গিয়েছিল এই দেশটা পচা হয়ে যাচ্ছে আরও। কেউ আর ভাল থাকে না। কেউ আর ভাল থাকবে না। চিঠি, জানি তুইও আজ ভাল নেই।

সেই কবে রেডিও-তে শুনতাম ‘কোথায় হারিয়ে গেলে’। চিঠি আসত সেখানে। বন্ধু, বন্ধুনী, ভালবাসার মানুষ কিংবা নেহাতই পাড়াতুতো পরিচিতি। বহু বছর পর তাদের খোঁজ চলত চিঠি দিয়ে। আমিও ভেবেছিলাম তোকে পাঠাব। সেই স্কুলে পড়ার সময় অন্বেষাকে মনে আছে? যার বাড়ির সামনে দিয়ে রোজ বিকেলে সাইকেল করে যেতাম আর ভাবতাম, একবার যদি দেখা যেত। অন্বেষাকে কোনওদিনও বলতে পারিনি, কতটা ভালবাসতাম ওকে। চিঠিও পাঠানো হয়নি কোনও দিন। রেজিওতে পাঠাবার কথা ছিল। অন্বেষাকে আমি খুঁজে পাইনি। এখন এসএমএস করে লোকে। পিং করে হোয়্যাটসঅ্যাপে। এখন কারোর কাউকে খুঁজতে হয় না। কেউ হারিয়ে যায় না। সবাই থাকে অলীক জগতে। তবু আমি আজও অন্বেষাকে পাইনি। কিংবা পত্রমিতালীর সেই দিনগুলো। ছোটো বেলায় কত করে ভাবতাম, অন্বেষাও যদি আমার চিঠিবন্ধু হত..!

এখনও বেশ মনে আছে আমার প্রথম চিঠির কথা। পারমিতা পাঠিয়েছিল লাইন টানা ছেঁড়া কাগজে।

“তুমি অর্পিতার হাত দিয়ে চিঠি পাঠিও”।

আমার এখনও মনে আছে। কিন্তু মনে করতে পারি না প্রথম অর্কুটের মেসেজ। প্রথম ফেসবুকের পিং। অথবা প্রথম হোয়্যাটসঅ্যাপে ‘হাই’ কাকে লিখেছিলাম। চিঠি, তোমার সঙ্গে এটাই বোধহয় এদের পার্থক্য।

“টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে, কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে

সেইসব চুপচাপ কোনো দুপুরবেলার গল্প

খুব মেঘ করে এলে কখনও কখনও বড়ো একা লাগে, তাই লিখো

করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করেও হলে বলো, ভালোবাসি”।

-মহাদেব সাহা

এখন করুণা করেও কেউ চিঠি লেখে না। হারিয়ে যাচ্ছে আদরিয়া এই শিল্প। চিঠি, তুই কবিতাতেই থাক। থাক গানে, গল্পে, সিনেমায়।

রবী ঠাকুরের মতো খুব কম লোকই চিঠিকে আদর করতে পেরেছে। পাঁচ হাজারেরও বেশি চিঠি লিখেছিলেন পাঁচশো জনেরও বেশি মানুষকে। ভালবাসা এতটাই ছিল, যে বাবাকে লেখা প্রথম চিঠিখানাও তাঁর বেশ মনে ছিল।

 ‘বেশ মনে আছে, আমাদের ছেলেবেলায় কোনো এক সময় গবরমেন্টের চিরন্তন জুজু রাশিয়া কর্তৃক ভারত আক্রমণের আশঙ্কা লোকের মুখে আলোচিত হইতেছিল। … এইজন্য মার মনে অত্যন্ত উদ্বেগ উপস্থিত হইয়াছিল। বাড়ির লোকেরা নিশ্চয়ই কেহ তাঁহার এই উৎকণ্ঠা সমর্থন করেন নাই। মা সেই কারণে পরিণত বয়স্ক দলের সহায়তা লাভের চেষ্টায় হতাশ হইয়া শেষকালে এই বালকের আশ্রয় করিলেন। আমাকে বলিলেন, ‘রাশিয়ানদের খবর দিয়া কর্তাকে একখানা চিঠি লেখো তো’। মাতার উদ্বেগ বহন করিয়া পিতার কাছে সেই আমার প্রথম চিঠি। কেমন করিয়া পাঠ লিখিতে হয়, কী করিতে হয় কিছুই জানি না। দফতর খানায় মহানন্দ মুনশির শরণাপন্ন হইলাম। … এই চিঠির উত্তর পাইয়াছিলাম। তাহাতে পিতা লিখিয়াছেন, ভয় করিবার কোনো কারণ নাই, রাশিয়ানকে তিনি স্বয়ং তাড়াইয়া দিবেন।’

রবীন্দ্রনাথের শেষ চিঠি তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে সেই চিঠিতে ছিল মাত্র ৭টি বাক্য। তারমধ্যে একটি,

‘তোমাকে নিজের হাতে কিছু লিখতে পারিনে বলে কিছুতে লিখতে রুচি হয় না।’ চিঠি, সুনীল-শক্তিও হারিয়ে গিয়েছে কোথায়। বুদ্ধ গুহবাবুরও বয়স হয়েছে অনেক। তোকে আর রাখবে কে?
“ডিয়ার আসমা চোধুরী জয়িতা…” বিশ্বাস কর ন্যাবারও আর চিঠি লেখার সময় নেই। ইউটিউবেই এখন যেরকম ‘প্রিয় বন্ধু’ চাইলেই শোনা যায়, যেরকম ক্যাসেটের পর সিডিদের অপমৃত্যু, তার তালিকাতেও তুই, ‘চিঠি’। তবে এখনও তুই আসিস বটে। হুমকি চিঠি/ এখনও আসে/ হঠাৎ করে/ রাত দুপুরে। অনাহূত/ খুন করে যায়/ ঘাড়ের কাছে/ একটা কোপে। মুক্তমনা/ প্রশ্ন করে? ‘নিষেধ আছে’, সেই কারণে/ রক্ত ঝড়ে! চিঠি ভালবাসার যেমন, ভয়েরও তেমন। আগেকার দিনে মনে নেই? ডাকাত আসত হা রে রে রে করে? রীতিমতো চিঠি দিয়েই তারা আসত। এখন হুমকি ফোন আসে। ফেসবুকে আলাপ জমায় সাইকো ভিলেন। খুন করে প্রেমিকাকে সিমেন্টের বেদির তলায় পুঁতে রাখে। চিঠি, তুই থাকলে হয়ত মেয়েগুলোর চোখে-মুখের স্বপ্ন ওত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত না। তুই নেই বলেই কাছে আসাটা বড় তাড়াতাড়ি। চিঠি, তোর মধ্যে দিয়েই আগে, মনের আনাচকানাচ ঘুরতে হত সবাইকে। শরীর আরও পরে। এখন পরেটাই আগে আসে, তাই সুক্ষতাও জলে ভাসে চটজলদি। এখন ভালবাসা নয়, লোকে প্রেম করে। আত্মহত্যার আগে শেষ চিঠি লেখাটাও এখন কমিয়ে দিচ্ছে সবাই- মৃত্যুর আগে পোস্ট, গুড বাই…! মার্কিন ঔপন্যাসিক হান্টার এস থম্পসন শেষ চিঠিটি দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীকে। লিখেছিলেন,

“আর কোন খেলা নেই। আর কোন বোমা নেই। চলতে থাকা নেই। কোন মজা নেই। সাঁতার কাটা নেই। ৬৭। ৫০ এর পরেও ১৭ টি বছর। আমার চাওয়ার অথবা দরকারের চাইতেও ১৭টি বাড়তি বছর। বিরক্তিকর। আমি সবসময়েই উদ্দাম। কারো জন্যে কোনও আনন্দ নেই। ৬৭। তুমি লোভী হয়ে যাচ্ছ। বুড়োমি দেখাও। শান্ত হও- এটা ব্যথা দেবে না।”
এর দিন চারেক পরেই নিজেকে গুলি করেন থম্পসন। স্ত্রীর সাথে টেলিফোনে কথা বলছিলেন, কথা বলতে বলতেই গুলি..। এখন ফেসবুক লাইভেও আত্মহত্যা করেছেন অনেকে। চিঠি, সেখানে অকিঞ্চিৎকর। মৃত্যুতেও এখন ব্রাত্য, চিঠি।

অথচ একসময় তোর শক্তিতেই প্রবাহিত হয়েছিল নীল নদ। আবু বকরের মৃত্যুর পর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হন হযরত ওমর(রা.)। মিশরে সেবার খরা। নীল নদ শুষ্ক। দেশের সবাই দ্বারস্থ হলেন ওমরের কাছে। ওমর নীল নদকে চিঠি লিখলেন।

 ‘আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীন ওমর-এর পক্ষ থেকে মিশরের নীলনদের প্রতি…, যদি তুমি নিজে নিজেই প্রবাহিত হয়ে থাক, তবে প্রবাহিত হয়ো না। আর যদি একক সত্তা, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তোমাকে প্রবাহিত করান, তবে আমরা আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করছি, যেন তিনি তোমাকে প্রবাহিত করেন।’
খলিফার সে চিঠি ফেলে দেওয়া হয়েছিল শুষ্ক নীল নদের বুকে। আল্লাহ নীল নদকে পরিপূর্ণ করলেন। এতটাই পরিপূর্ণ, যে আজও নীলনদের জল কখনও শুকিয়ে যায় না। কিন্তু চিঠি, তোর জন্য কোনও ইচ্ছে নেই, কারোর সময়ও নেই।

আমার এক বন্ধুনী আমাকে শেষবার লিখেছিল,‘তোমাকে স্বাধীন-শর্তহীন ভাবে, মন থেকে চেয়েছিলাম। উচিৎ-অনুচিৎ-ঠিক-ভুল-আগে-পরে হিসেব করা হয়নি। মনে হয়েছিল, তুমি যদি হও প্রকাণ্ড বিপ্লব, আমি তোমার ভিতরের দাবী দাওয়ার উচ্চাকাঙ্খী স্লোগান..চাল-ডাল-তেল-নুনের হিসেবে বাঁধা সম্পর্কের বাইরে এমন একটা স্পন্দন, যেখানে বিনা দ্বিধায়-বিনা বাধায় পাঁজরের কারাগারে যাবজ্জীবন চাওয়া যায়..যেখানে ঘর করা হয় না, ঘর গড়া যায়’। শুনেছিলাম, বন্ধুনীটির ভাই এখন ভাঙড়বাসীদের হয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে সাতটি মামলাও ঠুকেছে। অন্যের ঘর রক্ষায় সে নিজের ঘর ছেড়েছে। আমার ঘরও গড়া হল না, বন্ধুনীটির চিঠির উত্তরও দেওয়া হল না। ফেসবুক-হোয়্যাটসঅ্যাপ-এসএমএস-এর হট্টগোলে চিঠি, তোকেও আর পাওয়া হল না। জানি, আর হয়ত পাওয়া হবেই না কোনও দিন। অতঃপর, পুরোনে চিঠিতেই রাখলাম গোলাপ। প্রিয় চিঠি, হারিয়ে যাওয়া চিঠি, ভাল থাকিস…।



“আমি আজকাল ভাল আছি

তোকে ছাড়া রাতগুলো আলো, হয়ে আছে..

…শোন অভ্যেস বলে কিছু হয় না এ পৃথিবীতে

পালটে ফেলাই বেঁচে থাকা

আর একশো বছর আমি বাঁচবোই জেনে রাখ

হোক না এ পথঘাট ফাঁকা…”। – অনুপম
                                                                                                         -ইতি, চিঠি

ঘাসফুলেদের সাথে

তুমি সারাক্ষন খুঁজে গেছো দুপুর সন্ধ্যে বেলায়, সময় দাওনি ঘাস ফুলেদের। লিলুয়া বাতাস হয়ে ছুয়ে গেছো দূর আরো দূর বেপাড়ায়… ফিরে গেছে সে নদী...