ইতি ফেলুরাম

 
ত্রিকোনামিতির কসথিটা বাই ট্যান থিটা আর ফ্রক পড়ে আসেনা অনু, আমি হোলস্কয়ার ছুঁয়েও দেখেছি তোর ঠোঁট আরো নরম। 
 
এর পেটে ওর বাহু ঢুকিয়ে দেওয়া উপপাদ্যের দেহে রবি ঠাকুরও একটুকরো কবিতা নামাতে পারলেন কই? আমি সম্পাদ্যের বৃত্তকে অনেক কষ্টে দুই ভাগ করতে শিখেছি অনু, উত্তর না মিললেও তোর চোখের তারা কোনো কম্পাসেই গোল হবে না জানি। 
 
কবিদের পাটিগনিতে কখনো সখনো সুদকষা খুঁড়ে কেঁচো চাষ হতে পারে জানিস? এইটের প্রশ্নমালা জুড়ে প্রতিটা অঙ্কই সযত্নে উই পোকার তলপেটে সঞ্চিত তাই আমার অঙ্কের উত্তরেও পদ্যুত -বাবু দুটি অন্তঃসার শূন্য উপহার দিতেন,
আমি জানি শূন্য মানেই নিজের মত করে আকৃতি বসিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা । 
 
ভাগ্যিস বার বার অঙ্কে ফেল করেছি, না হলে তোর প্রেম কে এক্স ধরে ল্যাজা মুড়ো ফ্যাক্টর এত বার ছিন্ন করত যে কেশি নাগও সহজ পাঠের দ্বীতীয় সংস্করণের কথা ভাবতেন।
নিমাই স্যার বলেছিলেন আমি অঙ্কে কোনোদিন পাশ করতে পারব না
ইচ্ছে হল বলি-"স্যার যোগ বিয়োগটুকুও কেমন করে ভুলতে পারি?"
তুই বল তেরোর নামতা মুখস্ত রেখে কে কবে মহান প্রেমিক হতে পেরেছে?

ইতি , তোর ছেলেবেলা

জানিস, কোনো এক বিষন্ন বৃষ্টিভেজা সন্ধায়
তোকে কখনো বলা হয়নি ভালো থাকিস ,
ভীষণ আকাশ ভেঙ্গে আসা বৃষ্টি ঠেলে বিরক্ত তুই যখন বাড়ি ফিরতিস ,
হটাত করে তোর কাঁধে হাত রেখে বলিনি ভালো থাকিস ,আবার দেখা হবে
কোনো এক বাসের জানালায় তুই যখন বৃষ্টির দাপাদাপিতে বিরক্তি নিয়েই জানালার প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিস,
রাস্তার পাশে ভেজা একটা ল্যাম্প পোস্টার নীচে কাকভেজা এই আমি ,
তোর চোখে চোখ রেখে বলিনি ভালো থাকিস ,আবার দেখা হবে, হারিয়ে যাসনা.....

আমাকে তো তুই পাগল বলেই জানতিস ,সেই ছেলেবেলা থেকেই বৃষ্টি মানেই ছন্নছাড়া এই আমার একলা হেঁটে যাওয়া ....
অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস না ?
অনেক নিয়ম মেনে চলিস এখন,
রোজ নিয়ম করে অফিস যাস ,রোজ একটা বিচ্ছিরি রকম সময়ে হাসিমুখে পত্রিকার পাতা উল্টাস.......


রোজ যখন তুই গম্ভীর মুখে বাসা থেকে বের হস, আমি পর্দার আড়াল থেকে এখনো তোকে দেখি,
হটাত চোখে চোখ পড়লে ছিটকে পালিয়ে আসি ,,যদি চিনে ফেলিস...
আচ্ছা, তোর কি মনে আছে সেই কথাগুলো? বর্ষার সময় ব্যাগে একটা পলিথিনের পাকেট রাখতিস ?
যেদিন খুব বৃষ্টি হত সেদিন বইগুলো প্যাকেটে মুড়ে ব্যাগের মধ্যে রেখে ভিজতে ভিজতে বাসায় ফেরার দিনগুলো ,
বাসায় কি বকাটাই না খেতিস তুই! তবু পাল্টাতিস কোথায়?
এখন অনেক কিছুই পাল্টে গেছে রে ,এখন বৃষ্টি দেখলে তোর চোখের কোনে জল ,
পাল্টে গেছিস না অনেক???
অনেক বেশী প্রশ্ন না তোর মনে !!!

তবু বলে যাই ভালো থাকিস ,
আবার দেখা হবে .....

ইতি ,
তোর ছেলেবেলা

নিছক রাত জাগার বাহানা




বৃষ্টির শহরে বিষন্ন বিকেলের রঙ
পালটে দিয়েছিল সে চায়ের টেবিল।  

লুচি-ডালের অদ্ভূতুরে সময়ের আড্ডাবাজি
আর গতিপথে উড়ে আসা সহস্র বৃষ্টিকণার
ভেতর পূণর্বার জেগে উঠা
অতীত দিনের বিচ্ছিন্ন সব সুরের আকস্মিক
খোঁজ।
আমাদের বেঁচে থাকা জলমগ্ন দুঃস্বপ্নের মত
অথচ বৃষ্টি জল ফেরায়
নিখোজ হয়ে যাওয়া মগ্নতার দিন। মায়ের
আচলের সেই সে ওম।
মাকড়শার জালের ভেতর থেকে কবিতা বুনার
আশ্চর্য সব সূত্র আর
পৃথিবীর কোথাও দুঃখরা থাকে, তা অস্বীকার
করার দীপ্ত সাহস।
অথচ তুমি আমি ভালো করেই জানি, শহরের
দুঃখভার অধিক হলে
বৃষ্টিরা নামে, মেঘেরা ধারণ করে গভীর যত
কালো।

একা পাখি কথা কয়ে যায়




ঝরা পাতার মত পড়ে আছে একটা পালক !
নিথর-বয়সি ঝরাপাতা, জোছোনায় নামলো বুঝি
চাঁদ গ্রামগঞ্জের মেঠোপথের কোল ছুঁয়ে !

তখন জোনাকিরা ক্লান্ত আলোর পথ ধরে
এগুচ্ছে -তমালের-শিরিষের শিশিরে গা ভাসাবে
বাকি রাতটুকুর রুপ ধরে ধরে...

শুনতে পাই একা পাখির করুন ডানার ছন্ধ আর
সেইসব দৃশ্যাবলি পাঠ শেখায় ঝরা পাতার।

বাতাসে সঁপেছিলো চাদ সবটুকু
পরশ্রিকাতরতায়, দূরে মাঠের সনাতন দেবদারুর
সংবিগ্ন শাখায় ভিন্ন বেহাগি সুর।

চাঁদের তখন দুই দিন ! এই দিকে অরন্যের স্বাধীনতায়
পা ডুবিয়ে একা পাখি, জন্মান্তরের হিসেব হয়ে
যাচ্ছে- ওইদিকে পাড়ায়-পাড়ায় শিশুদের ঘুমের
ঘোরের কান্না-বিচ্ছেদি সানাইয়ের মত
শোনালো !

নক্ষত্র মনে রেখে রেখে পালকের নিচে
নিজেকে লুকিয়েছে পাখি- উজাড় জীবন বৃক্ষের
সংকেতে ।

এই স্বপ্নের সৎকার হিরন্ময়
বাস্তবতা !

ঝিঁঝিঁরাও চুপ.. তারপর একা পাখি
হরিয়াল- অন্তরের বৃক্ষটাকে বের করে এনে
কথা ক'য়ে যায়...কথা ক'য়ে যায়....

হৃদয়ের সব কথা ঝরে পড়ে নিমের পাতায়

নিমের ডালপালা ছুঁয়ে তেরচা রোদ এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। কিছুটা বিছানাতেও মাখামাখি হয়ে কুকুরকুণ্ডলীর মতো পা গুটিয়ে পড়ে আছে। দুপুরবেলা কী একটা অজানা পাখি ডাকছে। সেই ডাক শুনে মা এসে দাঁড়াল জানলায়। জানলার ঠিক বাইরেই অতিকায় ঝাঁকড়া নিমগাছ। তারই চিত্রবিচিত্র পাতার আড়ালে লুকিয়ে ডেকে যাচ্ছে পাখিটা। তার স্বরে যেন অনেক পুরনো দিনের কাতরতা।
"দেখ কী সুন্দর পাখিটা!"-মায়ের গলায় কিশোরীসুলভ উচ্ছ্বাস। " নাম জানিস এর?"
"কোথায় দেখি?"
জ্বর এসেছিল, তবু অলসতা কাটিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। সবুজ পাতার পাশে এক টুকরো উজ্জ্বল হলুদ। পাখির নাম জানতে পারিনি।
সেই হেমন্তের দুপুরে মা আর তাঁর সন্তানের পাখি দেখার দৃশ্যটি আজও ওই জানালায় স্থির হয়ে আছে।


ফাঁসুড়ের যেমন কিছু করার থাকে না, হাতল টানা ছাড়া। তাঁর হাত আর হাতলের দূরত্ব যতটুকু, মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তের আয়ুও ঠিক ততদূর।
নিমগাছটাকে কেউ বা কারা মৃত্যুদণ্ড দিল!
রাতেও দেখেছি তাকে। জানলা খুলে। ঝুঁকে এসেছিল, কাঁপছিল তির তির করে উত্তুরে বাতাসে। বুঝতে পেরেছিল কি আজই তার শেষ রাত? বুঝতে পেরেছিল কি সারারাত মাথায় জেগে থাকা নক্ষত্রগুলো আর কোনও দিন কোটি কোটি বছর পেরিয়ে আসা আলো দিয়ে স্পর্শ করবে না তার হাত, করতল আর আঙুলগুলোকে?
হাতে কুঠার, ফাঁসুড়ে এসে দাঁড়ালেন সকালবেলায়। অভিজ্ঞ চোখে প্রথমে জরিপ করলেন অনেকক্ষণ ধরে। তারপর দড়ি বেঁধে দিলেন গাছটার দু-হাতে।
কুঠারের আঘাত নেমে এলো কাঁধে। বারবার।
রক্ত ছিটকে এসে পড়ল জানলায়। যেখানে মা আর সন্তানের পাখি দেখার দৃশ্যটি আজও স্থির হয়ে আছে।

এই খুনের দৃশ্যটির সাক্ষী থাকলাম আমি। কাজের মহিলা বললেন, "এখানে ফেলাট (ফ্ল্যাট) উঠবে গো মাসিমা।" 

মা বলল, "সেই হলুদ পাখিটা আর আসবে না বল!"

যে অভিমানের কোন সুনির্দিষ্ট কারন থাকে না--



আমি মাঝেই মাঝেই একটা স্বপ্ন
ঘুরে ফিরে দেখি।

স্বপ্নের দৃশ্যপটে হয়ত সামান্য অদল-বদল হয়।
কিন্তু মোটের উপর স্বপ্নটা প্রায় একই রকম
থাকে।
স্বপ্নটা দেখতে শুরু করলেই
চেনা মানুষকে ভীড়ের মাঝে খুঁজে পাবার মতন
আনন্দ হয়। কিন্তু একই সাথে কোথাও যেন
একটু দুঃখ ফুলের পাপড়ির ওপর
জমে থাকা শিশিরের মত টলমল করতে থাকে।

আমি দেখি একটা ছোট্ট মেঠো পথ।
সময়টা হল বিকেলবেলা। স্বপনে আমি সূর্য
দেখিনা কখনোই। বরং দেখি একটা ছোট
কুড়ে ঘরের শনের ছাতে ঝিলমিল
করতে থাকা স্বর্ণাভ আলো। আলোটা খুব
মিঠে মিঠে। বেশ বুঝতে পারি এইটা হয়ত আমার
দেশের হেমন্ত কালের কোন বিকেল বেলা। সরু
যে পথটা দেখেছিলাম, একটু পরেই
দেখি সেইটে একটা বিশাল সবুজ ধানের মাঠের
মধ্যে দিয়ে এক ছুটে চলে গেছে দূরে। হঠাৎ
করে দেখলে মনে হয় যেন একমাথা সবুজ চুলের
কারোর মাথার হয়ত সিঁথি এই পথটা। আমার
স্বপ্নে আমি এই পথ ধরে হাঁটতে থাকি। কোন
কোন দিন, মাঠের ধানের ঘ্রাণটা পর্যন্ত পাই ।
আমি দেখি-- আমি খালি পায়ে হাঁটছি এই
মেঠো পথে। দু'পায়ে অলস মায়ায়
জড়িয়ে আছে ধুলো, হঠাৎ
আসা একটা দমকা হাওয়ায় পরনের
পাঞ্জাবীটা পত পত শব্দ করতে করতে নৌকার
পালের মতন ফুলে ফেঁপে উঠতে চায়।

আমি হাঁটতে থাকি--হাঁটতে থাকি--
হাঁটতে থাকি---

আমি অলস পায়ে হাঁটি--আমি বুঝতে পারি,
আমার এই হাঁটার উদ্দেশ্য কোথাও
পৌঁছানো নয়--আমি কোন গন্তব্যে যাচ্ছি না--
আমার ফেরার কোন টান নেই--আমার
আছে কেবল পথ হাঁটা---দু'পাশে ভীষন সবুজ
অবুঝ ধানের ক্ষেত,
মাঝে দিয়ে চলে যাওয়া ধুলোময় ছোট্ট পথ---
আর সেই পথের অলস পথিক আমি--

স্বপ্নটার এই জায়গাটাতে এসে প্রতিবার কেন
জানি চোখটা জলে ভরে আসে।
জানিনা কী কারণে একটা অবুঝ শিশুর মত
অভিমান হতে থাকে--কোন কারণ ছাড়াই।
ছোটবেলার মত অভিমান হয়--যে অভিমানের
কোন সুনির্দিষ্ট কারন থাকে না--থাকে শুধু
আকাশ সমান উঁচু অভিমান---

আজও একবিন্দু অশ্রুজলের মাঝে দেখি সেই প্রজাপতির রঙিন অস্থির ডানা



আজও একবিন্দু অশ্রুজলের মাঝে দেখি
সেই প্রজাপতির রঙিন অস্থির ডানা ,

যে নাকি উড়ে গেছে আলোকবর্ষ আগে।

প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসেও সে লুপ্তপ্রায় ।

চুরি হয়ে গেছে সেই সব কিছু
যেগুলো আমি কখনই হারাতে চাইনি ।

বাহিরে অন্তরে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেছি
উত্তপ্ত অঙ্গার, মেরুর বরফ, আবার বিষের
নালায়,

কখনও বেপরোয়া হাওয়া হাত পোড়া ছাই
উড়িয়েছে,

কখনও বা ঝরনা ধারা ছিন্ন দেহ বয়ে নিয়ে গেছে
লেলিহান সমুদ্রে,

মরুভূমির বালুকারাশি
সেই আগুন নেভাতে এসে, করেছে আমায়
সমাধিস্থ ।

তবে থেমে থাকিনি, সেখানে থেকেই
নিয়েছে পুনর্জন্ম
অবিরত খুঁজেছি সেই চিহ্ন গুলো,

অনুসরণ করেছি তার পায়ের ছাপ,
অবশেষে ক্লান্ত সূর্যের মতো পশ্চিম
আকাশে গিয়েছি অস্ত ।

এভাবেই পেরিয়ে গিয়েছি অসংখ্য যুগ,

কিন্তু এখনও ফিরে পাইনি তার প্রমাণ চিহ্ন 


হারিয়ে ফেলেছি অবশিষ্ট টুকুও ।

অজস্র শব্দের মিছিলে উঁকি দেওয়া কতিপয় রাত



কবিতার কথা বললেই গ্রামের শ্যাওড়া গাছটির
স্মৃতি চোখে ভাসে।

আহা, সেই অন্ধকার
নামানো গাছ।
শীতের রাতে কুয়াশা বিলির
একমাত্র প্রতিনিধি।

মাথা উচু ডালের
থেকে বেড়িয়ে আসা স্মৃতির বিড়াল। আমি কিচ্ছুই
দেখিনি।

গ্রাম শ্যাওড়া শূন্য হয়েছে জন্মের
কতদিন আগে।
অথচ শীতের সন্ধ্যা হলেই
মনে পড়ে, একটা বুড়ো শ্যাওড়া গাছ
ভেংচি কেটেছিল আমার তরুণী মাকে।

আহা,
শ্যাওড়া গাছ! শীতের ভেজা সন্ধ্যা!

বয়সের ছাপ
কেন পড়েনা স্মৃতি কথায়!

তবু ধরে রাখতে ইচ্ছে করে,



কেউ চলে যাবে,হয়তো কেউ-
অনেক কাছে থেকেই ভুলে যাবে।
তবু ধরে রাখতে ইচ্ছে করে,
তবু পাশে থাকতে ইচ্ছে করে…

রাশি, রাশি গল্প বলা রাত-
হয়তো একদিন
ভোর হবে,
জানি আর কখনোই ফিরবে না
সেই রাতের-ই টানে।


আমার এই ছোট শহরে যারা ছিল
-সবাই আছে,
এখনো পদ্যে খুঁজি,গদ্যে আঁকি,
ভুল করে হলেও তোমাতে হারাই।

একলা ঘর,কিছু পুরনো স্মৃতি
এলোমেলো তোমার প্রিয় বই-
একলা জ্বলা মোমবাতি,
ধুলো জমা সেই গিটারে-
বিষাদী সূর বাজে।

এখনো আকাশে মেঘ জমে বৃষ্টি পড়ে,
এখনো আমি ভিজি…

তুমি, আমি আর এক ঝাঁক হতাশার পাখি



তুমি এখন আর স্বপ্ন বানাও না,
এখন আমিও আর স্বপ্ন দেখি না,
এখন আর তুমি বৃষ্টিতে ভিজো না,
সব সময়কার মত বৃষ্টি জলে শুদ্ধ
হতে আমি চাইনা অনেকদিন…

তুমি সন্ধ্যা ঘনালে লালচে আকাশে মেলাও,
আমি একটা দুটা তারা গুনে গুনে ক্লান্ত হই…

আমি বারান্দার ঝুলন্ত দোলনায় দুলতে দুলতে
এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি।

তোমার গড়া স্বপ্নগুলো আমার চোখে হাত
বুলায় না তখন,
রাতের
আঁধারে চুপি চুপি স্বপ্নগুলো ডানা মেলে না।
উড়ে উড়ে আমার আকাশে রঙ ছড়ায় না।

কাকডাকা সকালে তুমি ব্যস্ত
পায়ে হেঁটে হেঁটে যাও
একটু খানি আকাশ দেখার তোমার হয়না অবসর,
আমি সেই আকাশের ছোট্ট প্রজাপতি হই না।

তবুও তুমি জানো, আমি জানি-আমাদের
স্বপ্নগুলো এক…

সেখানে আজও তোমার আঠারো বছর আঁকা আছে

জার্মানের রাস্তায়, কলকাতায় কিংবা পুরোনো পল্টনে
একদিন ট্রাফিক জ্যামে তোমার গাড়ির সামনে
এসে দাঁড়াবে এক পাগল...
এলোমেলো চুল-দাড়ি, চামড়ায় শ্যাওলা পোষাক-
যখন দিনের শেষে সকলেই ঘরে ফিরতে চায়
তখন এ পাগলের কোথাও যাওয়ার নেই বলে
তোমার সামনে এসে ওই দ্যাখো...

দেখবে সেখানে আজও
তোমার আঠারো বছর আঁকা আছে।।

আমরা চার বন্ধু আর বৃষ্টি

প্রায়ই আমরা চার বন্ধু মিলে খোলা আসমানের
নিচে গল্পগুজব করতাম। পাশে দাঁড়িয়ে থাকত
একটা সাদা তিনতলা বাড়ি। মাঝেমাঝে বাড়ির
রং আর আসমানের রঙ মিলেমিশে একাকার
করে বৃষ্টি নিচে নেমে আসত।
আমরা খোলা আসমানের নিচে ঠায়
দাঁড়িয়ে থাকতাম অথচ কেউই ভিজতাম না।
কারণ বৃষ্টি ছিল সাদা রঙ তিনতলা বাড়ির
তিনতলার মেয়েটির নাম। একদিন দেখলাম
বাড়িটা লাল করে সাজানো হয়েছে। লাল
রং বাতিরা চোখ লাল করে আমাদের
দিকে তাকিয়ে অনবরত চোখ টিপছে। সেদিনও
বৃষ্টি নিচে নেমে এলো, আমরা ঠিক আগের মত
করে খোলা আসমানে নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কিন্তু আমরা চারজন সেদিন ভিজে গেলাম। একটু
বেশি ভিজলো আমার সেই
খাটো করে কুকড়া চুলওয়ালা বন্ধুটি,
যে তিনতলা বাড়ির দিকে মুখ করে সবসময়
দাঁড়াত।

কথাকাব্য

শহরের কোন পুকুড়ের পাড়ে মাটি নেই।
সেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মাঝের আমি বসে থাকবো।
একা এবং একাকী।
পুকুড়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে কালো পিচের
মোড়ানো একটা পথ। সেই পথটাও
ফাকা থাকবে। আমি বৃষ্টির
মাঝে তাকিয়ে দেখবো নীল ছাতা মাথায়
দিয়ে কে যেনো গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে।

লবনাক্ত নদীর গতিপথ



কেউ একজন কখনোই বোঝেনি,
সন্ধ্যা ঘণালে আমি ভুলে যাই
পৃথিবীর উপকূলে জোনাকী জ্বলে,
যখনি মানুষেরা খুঁজে ফেরে
আদিম জনপদ -
কেউ একজন কখনোই জানেনি,
তেমনি কোন রাতে
একাকী জোছনা দেখবো বলে
আমি সাঁতরে যাই কর্ণিয়া ফেরত
লবণাক্ত নদীর গতি পথ -



একদিন ষোড়শীর বুকেও লাল ক্ষত চিহ্ন এঁকে দিয়ে সপ্তদশীতে ডুব দেবে তোমরা




নমস্কার। তোমরা সবাই খুব ভালো থেকো। তোমাদের জীবনের সব চাওয়া, পাওয়ায় পরিণত হোক। তোমাদের জীবনে আসুক হাসি, আনন্দ, সাফল্য। আলোয় ঝলমল করে উঠুক তোমাদের জীবন। এত সব শুভেচ্ছার বহর দেখে ভাবছো নিশ্চয়ই আমি কে? এ মা। এখনও চিনতে পারোনি! সত্যিই? কি গো তোমরা? আচ্ছা থাক। তোমাদের উপর অভিমান করে আর যাবো কোথায়! আগামী ৩৬৫ টা দিন তো তোমাদের সঙ্গেই লেপটে থাকব। তোমাদের কত স্বপ্নের জাল বোনা হবে আমারই বুকের ওপর। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো আমি কে? এখনও পারোনি! হাঁদারাম, মাইরি।
আরে বাবা, আমি ষোড়শী। এবার চিনতে পারলে নিশ্চয়ই। এই যে তোমরা কাল রাত্তির থেকে সবাই মিলে 'হ্যাপি নিউ ইয়ার/হ্যাপি নিউ ইয়ার করছো', সে তো আমার জন্যই। আমিই হলাম ২০১৬। আরও ভালো করে বললে, শুধু ১৬। আর তোমার মনের কাছাকাছি আসার জন্য চুপি চুপি কানের কাছে এসে বলা। 'ষোড়শী। মানে সুইট সিক্সটিন'। সদ্য বাড়তে থাকা যুবতী। এবার তোমার সঙ্গে কাটাতে এসেছি পাক্কা একটা বছর। খুব মজা করব দুজনে হ্যাঁ?
ও, মনে পড়েছে। কালকে রাতে আমি যখন তোমার জীবনে এলাম, তখন দেখি ওই অন্ধকারে বসে কে একটা কাঁদছে। কাছে গিয়ে দেখি '১৫'! বেচারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে অ্যাকসা। কী অভিমান, কী অভিমান। ওকে যে তুমি, তোমরা এভাবে বিদায় জানিয়ে দিলে, এটা কিছুতেই মানতে পারছে না। শেষে বললাম, বোকার মতো না কেঁদে, একসঙ্গে কাটানো ভালো দিনগুলো মনে করো। দেখবে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি কিন্তু মোটেই এরকম 'পনেরো' মার্কা ন্যাতানো নই। আমার বুকে অনেক আগুন। সে আঁচ তো বোধহয়, এখনই টের পেয়েছো? গোটা ৩১ ডিসেম্বর রাতটা বাইরে কাটালে। কই একটুও ঠাণ্ডা বা শীত ছুঁতে পেরেছে তোমায়? এখন থেকেই আমার এই উষ্ণতায় কীভাবে আগলে রাখা শুরু করেছি বলোতো? আর ওসব ঢং-ফং আমার আসে না। পরিষ্কার বাংলা বাস্তব বুঝি। তোমার সঙ্গে আমার ৩৬৫ দিনের সম্পর্ক। সে তোমার আমার সম্পর্ক যত ঘনই হোক শেষবেলায়। হাতছাড়া-ছাড়িটা হবেই। তখন তোমায় হাজার বোঝালেও আর সুইট সিক্সটিন মনে ধরবে না। তখন কে আর ষোড়শী? ঠিক গিয়ে আশ্রয় নেবে 'সপ্তদশীর'। সিনেমার শেষ যখন জানাই, তাহলে আর নিরুপা রায় মার্কা কেঁদে ককিয়ে হবে কী!
আমরা মানে এই সালরা, কেমন জানো? এক, তো আমরা তোমাদের মতো মানুষ নই। আমাদের মতো এক কথার বান্দা আর পাবে না কোথ্থাও। ঘরের দেওয়ালে দিব্যি টানিয়ে রাখো। দুধ, গ্যাস, ইলেকট্রিক বিল, সবকিছুর হিসেব ফ্যাস ফ্যাস করে জঘন্য হাতের লেখায় আমাদের বুকে চালিয়ে দাও। তোমাদের মুখে কালি পড়লে আর রক্ষে নেই। অথচ, আমাদের মুখ, বুক, শরীরের কোন কোষটায় আঁচড় রাখতে বাকি রাখো? তবু, আমরা নীরবে সব সহ্য করি। ওই ৩৬৫ দিনের সম্পর্কটাকে দাম দিই। তোমাদের তো অনেক আয়ু। কত শতায়ু হওয়ার স্বপ্ন তোমাদের চোখে। আমাদের যে ওই সাড়ে তিনশো দিনেরই জীবন।
শুনতে খারাপ লাগবে না, তোমাদের। কারণ, তোমরা তো আমাদের কখনও অনুভব করোনি। প্রয়োজনে কাজে লাগিয়েছো। কতবার বিভোরভাবে অপলকে তাকিয়ে থাকো। কিন্তু সব নিজেদের ভালো-মন্দর হিসেবের জন্য। চোখ পড়ে আমাদেরই শরীরে। অথচ, তোমরা তখন দিব্যি ভাবতে পারো, অন্য নারী বা অন্য পুরুষের কথা। আমাদের জ্বালাটা তোমরা বুঝবে না। ওই তোমাদের একটা সিনেমার ডায়লগ আছে না? 'তুম নেহি সমঝোগে রাহুল। কুছ কুছ হোতা হ্যায়'! ওরকম আমাদের মনও বলে, তোমরা কিস্যু বুঝবে না। বুকটা ফেটে যায়। তোমাদের ঘরের দেওয়ালে আটকে থেকে প্রতিনিয়ত তোমাদের দেখা আর তোমাদের কথা ভাবা ছাড়া, আমাদের জীবনে আছে কী বলো তো? জানি না, তোমাদের মানুষদের এমন পরিস্থিতিতে কেমন হয়। একবার ভাবো--যে তোমায় ভালোবাসে, যে সবসময় ভাবে এই ৩৬৫ দিনে তোমার যেন জীবন সাফল্যের হাইওয়েতে ফোর্থ গিয়ারে ছুটে চলে, সেই তার বুকেই লিখে রাখো, কবে তুমি ডেট করতে যাবে, অন্য কারও হাত ধরে! হাঃ, হাঃ, হাঃ।
পনেরো বলছিল, ও যে ঘরটায় টেবলের উপর থাকতো, সেই ঘরের ছেলেটির নাম ছিল তোতা। পনেরোর চোখের সামনেই তোতা কতদিন তার নিজের ময়নায় মিশে গিয়েছে, টেবল থেকে মাত্র এক হাত দূরের বিছানাটায়। পনেরোর চোখ ফেটে জল আসতো। কেউ সে চোখের জল দেখেনি কোনওদিন। পনেরোর এই কথাগুলো শুনে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, তোমাদের মানে তোমাদের মতো মানুষদের তো কিডনিতে পাথর জমে। আর আমাদের ক্যালেন্ডারের সালদের পাথরের ঢিপি তৈরি হয়ে যায় বুকে। কেউ সরাবে না কোনওদিনও। তাই পনেরোকে কথা দিয়ে এসেছি, ওর মতো ভুল আর করব না। কাউকে ভালোবাসা তো দূর, কারও দিকে তাকাবোও না। আমার আয়ুই যদি তোমার দেওয়ালে ৩৬৫ দিনের হয়, তাহলে আর বোকার মতো মায়া বাড়াতে যাব কেন!
থাক, অত আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। পড়তে পড়তে এমন ভাব করছো যেন, আমাদের দুঃখ বুঝে উদ্ধার করে দিয়েছো। তোমাদের আমরা খোপে খোপে চিনি। গত ২০১৫ টা বছর ধরে আমাদের এতগুলো সাল কীভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, কেউ কোনও খবর রেখেছো? আজ এসেছে বড় চিন্তা করতে।
তোমাদের মন আমরা বুঝি। তোমরা আমাদের সাজিয়ে তো রেখে দেবে। ঘরের পোষ্যকেও পরিবারের সদস্য বলেই স্বীকৃতি দেবে। অথচ, আমরা তোমাদের কেউ হব না কোনওদিন। তোমরা শুধু নতুন চেনো। তোমাদের সব ভালোলাগা, ভালোবাসা ওই নতুনেই। খ্যাঁদা, বোচা, তোমাদের সব চলে। কিন্তু তোমাদের নতুন চাই। নাহলে তোমরা 'চেচিয়ে চেচিয়ে বেচার কথা বলো!' মন-প্রাণ থাকলে কেউ কিছু বেচতে পারে গো! মন-প্রাণ থাকলে এত বছরে একটাবারও তো বলতে পারতে, থাক অনেক হয়েছে, আমাদের চাই না, 'নতুন' বছর। ওই পুরোনোটাই রেখে দেব দেওয়ালে। ওটা দেখেই জীবনের পুরনো হিসেবগুলো করবে। নতুনভাবে বাঁচবে, পুরনোকে বুকে নিয়েই। নেই গো। তোমাদের অত দম নেই।
আজ আমার তোমাদের বাড়িতে প্রথম দিন। এই ষোড়শী 'শালা আমাদের সব সালের' দিব্যি কেটে বলছি, এক ফোঁটা কষ্ট পাব না, ২০১৬-র ৩১ ডিসেম্বর রাতটায়। একটাবারও মনে পরবে না তোমাদের কথা। তোমাদের বাড়ির আয়ার মতো এসেছি। আয়ার মতোই থাকব। গোটানো অবস্থায়, শরীর থেকে এক ঝটকায় গার্ডারটা খুলে নিয়ে আগে দেখে নিয়েছো, আমার শরীরের কোথায় কোথায় লাল কালি। ওই লাল কালি যে তোমাদের আলস্যের। আরামের। ফাঁকিবাজির। আর আমার? ওই লাল কালিগুলো আমার পূর্বপুরুষের ক্ষতচিহ্ন। আমি শরীরে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছি। একটা বছর পর যখন এক হ্যাঁচকায় আমায় সরিয়ে দিয়ে সপ্তদশীকে আমার যায়গায় আটকে দেবে, আমার শরীরে আরও অনেক লাল দাগ পড়বে গো। তোমাদের দেখার বা ভাবার সময় কোনওদিন ছিল না। সেদিনও থাকবে না। তোমরা তখন সপ্তদশীর নতুন শরীরে হাত বুলিয়ে ফের লাল রঙের ছোপ খুঁজবে।

নদীর শুদ্ধতা মেখে মানুষটা এখন যেকোনো দিকেই চলে যেতে পারে…

ঢালু জমি বেয়ে যে মানুষটা উঠে আসছে
নদীটির কাছে তার শেষ চাওয়া চেয়ে
সে এখন যেকোনো দিকেই যেতে পারে .......

কবিতার কাছে প্রলাপ নিয়ে,
অন্তত একটা চেনা মানুষের মুখ আঁকবে বলে
হারিয়ে ফেলা রং তুলির কাছে
কিংবা ব্রাত্য বীজ নিয়ে আবার মাটির কাছে
কৃষিকাজের অনুভবে...

আমরা কেউ জানিনা মানুষটা সুন্দরতম অপেক্ষাগুলো কে
গুমোট বাতাসে কিভাবে উড়িয়েছিল বিষন্ন মুঠিতে!


জল থেকে মাটি থেকে নদীর শুদ্ধতা মেখে

মানুষটা এখন যেকোনো দিকেই চলে যেতে পারে…

স্মৃতি, আজও দুপুরে ভালো থাকুক সেই জন

ভাঙা ইটের টুকরোর পোড়া দাগের ঘর
এক্কাদোক্কা খেলা বাড়ির উঠানে ।
কাল রাতে রঙিন কাগজ কেটে
তোর পায়ের নূপুর বানিয়েছি ,
তোর এক পায়ে লাফানো
সুযোগ বুঝে ছিঁড়ে ফেলি
এই নে !

দু হাত শূন্য কাগজের টুকরোরা রঙিন।
মুছে যায় এক্কাদোক্কার ঘর ,
উঠোন জুড়ে ব্যাঙের ছাতার উচিয়ে ওঠা মাথা
হাতের শূন্যে শূন্য ঘোরে
মুঠোয় বন্ধ ছেলেবেলা।

জানিস তো -
এখনো দুপুর কাটে
স্তরের উপর স্তর; সময়ের
ঠিক ঠাক মাপের নয়
তবুও খুঁজি ঘর গুলি।
নূপুর পরাই উঠোনের শেষে
প্রতিদিন রাগ করে এক পাশ মুখে দাড়াতিস যেখানে।

" কাল একটা ঘর বানিয়ে দিবি ? তবেই কথা
নইলে আড়ি; ওই শেষ বকটি আমার। "

এক ঝাঁক পানকৌড়ি পঁচা শামুক ঠোঁটে
অন্ধকার নামিয়ে শেষে আলটুকু নিয়ে যায় ।
" নইলে যে কাল ভোর হবে অন্ধকার ।
হারিয়ে যাবো আমারাও ! "

সবাই হারিয়ে যেতে পারেনা

আমি একবার ট্রেনে করে যাচ্ছিলাম, হকারের
কাছ থেকে একটা বই কিনলাম। বইয়ের লেখকের
নাম ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বইয়ের
নামটা মনে নেই। তবে এটা মনে আছে বইটা যখন
পড়ছিলাম তখন মনে হয়েছিল – যদি কোনদিন
এই ট্রেন না থামত, এই গল্প যদি কোনদিন শেষ
না হত। কিন্তু বাস্তবে ট্রেন থেমে গিয়েছিল,
গল্পটাও শেষ হয়ে গিয়েছিল।
এরপর থেকে যখনি আমি ট্রেনে করে দূরে কোথাও
গিয়েছি তখনি শরৎ বাবু আমার
সফরসঙ্গী হয়েছেন, সেটা শরৎকাল হউক আর
বসন্তকাল।


হারিয়ে যাওয়া ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় শখ।
বারবার ভাবতাম ইস যদি আমি কোথাও
হারিয়ে যেতে পারতাম। একদিন সেই লক্ষ্যে আর
ফিরব না বলে ঘর থেকে বেরিয়েও গিয়েছিলাম।
স্টেশনে যাওয়ার পর ট্রেনে উঠার সাহস আর
হয়নি। ঘরে ফিরে আসার পর বুঝেছিলাম –
আমাকে দিয়ে হারিয়ে যাওয়া হবেনা। আমার
দৌড় ঐ স্টেশন পর্যন্তই।

"বর্ণমালা চাই?"

আমার বর্ণমালা আজ বিপন্ন
শব্দেরা ঐশর্য্যহীন
কবিতায় তাই পোড়া গন্ধ।
আলোকপথ বেয়ে নামবেনা জানি
কোন ঐশ্বরিক
দিতে শব্দকোষের বরাভয়।
আমার কবিতায় তাই হাহাকার আজ
শব্দকূপ এ লেলিহান শিখা
পুড়িয়েছে যা ছিল বিন্দু
এখন অবশিষ্ট কিছু ছাই
দুঃস্বপ্নে ফেরিওলা হাঁক দেয়
"বর্ণমালা চাই?"

স্মৃতি, আজও দুপুরে ভালো থাকুক সেই জন


ভাঙা ইটের টুকরোর পোড়া দাগের ঘর
এক্কাদোক্কা খেলা বাড়ির উঠানে ।
কাল রাতে রঙিন কাগজ কেটে
তোর পায়ের নূপুর বানিয়েছি ,
তোর এক পায়ে লাফানো
সুযোগ বুঝে ছিঁড়ে ফেলি
এই নে ! 


দু হাত শূন্য কাগজের টুকরোরা রঙিন।
মুছে যায় এক্কাদোক্কার ঘর ,
উঠোন জুড়ে ব্যাঙের ছাতার উচিয়ে ওঠা মাথা
হাতের শূন্যে শূন্য ঘোরে
মুঠোয় বন্ধ ছেলেবেলা। 


জানিস তো -
এখনো দুপুর কাটে
স্তরের উপর স্তর; সময়ের
ঠিক ঠাক মাপের নয়
তবুও খুঁজি ঘর গুলি।
নূপুর পরাই উঠোনের শেষে
প্রতিদিন রাগ করে এক পাশ মুখে দাড়াতিস যেখানে। 


" কাল একটা ঘর বানিয়ে দিবি ? তবেই কথা
নইলে আড়ি;  ওই শেষ বকটি আমার। " 


এক ঝাঁক পানকৌড়ি পঁচা শামুক ঠোঁটে
অন্ধকার নামিয়ে শেষে আলটুকু নিয়ে যায় ।
" নইলে যে কাল ভোর হবে অন্ধকার ।
হারিয়ে যাবো আমারাও ! "

এসব ম্যাজিক কিন্তু মিমিদের অবাক শহরে ঘটে যাচ্ছে নিরন্তর

শীঘ্রই  আসছি এই বলে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া,
কাঁদুনে শীতের রোদ টুপটাপ জমে যাওয়া
বুড়োটে পাতায়।

আমরা হারিয়ে যাচ্ছি তাই,
ফিরে যাচ্ছে শেষ বাস।,

গুটি গুটি ফিরে যাচ্ছে ভৌ,
আমরা হারিয়ে যাচ্ছি ঝাপসা ফোনালাপে,
ফেলে যাচ্ছি মফঃস্বলি ঢেউ,

আমরা কুড়িয়ে নিচ্ছি চলে যাওয়া বছরের
এসপ্রেসো ওম,
আমাদের টাটা করে বাড়ি ফিরছে রাত।

ফিরে যাচ্ছে মাঠঘাঠ, এন আর আই নেশা,
আমরা কুড়িয়ে নিচ্ছি হারামি হাভাতে
একদা যে সমস্ত যুবক যুবতী
মরে গেছে পাড়া গেঁয়ে দুঃখ ছোঁয়াতে
তারা দেখি স্থিতপ্রঙ্গ আজোও
প্যালেস্টাইন রেখে যাচ্ছে শান্তির পাশে।।

এসব ম্যাজিক কিন্তু
মিমিদের অবাক শহরে ঘটে যাচ্ছে নিরন্তর, আমরাও
ঘুরে বেড়াচ্ছি পাগলের মতো,
চিনে রাখছি গলি, লতা পাতা
ফেলে যাচ্ছি নিরাশ্রয় ক্ষত।।

ভালোবাসা, বাড়ি আছো ?

ভালোবাসা, বাড়ি আছো ?

আমার এক বন্ধু কিছু দিন আগে ফেসবুকে ছোট্ট একটা পোস্ট শেয়ার করেছিল। অবনী অনলাইনে আছো?

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে এই ধরনের রসিকতা প্রথমে আমার ভাল লাগেনি। পরে মনে হল, সত্যিই তো, আজকের ডিজিটাল যুগে কি এই কবিতা লেখা যেত? বা আরও নির্দিষ্ট করে, অবনী বাড়ি আছো, এই লাইন আজকের কোনও কবি কি লিখতে পারতেন? কারণ, দরজায় কড়া নাড়ার আগেই তো মোবাইলে তিন বার দুজনের মধ্যে কথা হয়ে যেত।
শুধু তাই বা কেন? আজ যদি ডাকঘর’ লেখা হত? সেই ডাকঘরের অমল কি তাহলে চিঠির বদলে রাজার হোয়াটসঅ্যাপের জন্য অপেক্ষা করত? সেভ করে রাখত সুধার মোবাইল নম্বর! বা, অমল ভিডিও দেখত স্মার্ট ফোনে!

আমার আর এক বন্ধু অরিন্দমের (নাম বদলানো হয়েছে) প্রসঙ্গে আসি। সেকটর ফাইভে চাকরি করছে অরিন্দম। ওকে নিয়মিত বিদেশ যেতে না হলেও, অরিন্দমের বেশ কয়েক জন স্কুল-কলেজের বন্ধু সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তাঁরা আছেন আমেরিকা, ইংল্যান্ড, চিন, কানাডা, কাতার, লিবিয়া, নাইজেরিয়া-সহ প্রায় গোটা পনেরো দেশে। ফলে এক জন যখন ঘুমোন, অন্য জন তখন আপিস করছেন। তাদের নিজেদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। অরিন্দমদের এই গ্রুপে সূর্যাস্ত হয় না। ওরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, এই হল আমাদের সীমান্তবিহীন হোয়াটসঅ্যাপ দুনিয়া। বলা যায়, অনু-বিশ্বায়ন।

কিন্তু মুর্শিদাবাদে, বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা গ্রামের ছেলে মুকিবরের (নাম বদলানো হয়েছে) চিন্তা কখনই ওই সীমান্তবিহীন দুনিয়ায় পৌঁছতে পারছে না। তার কাছে আবার সীমান্তই রুটি-রুজি। সীমান্তই জীবন। সীমান্তই বিএসএফের বন্দুক। সীমান্তই ভয়। মৃত্যুও ছুঁয়ে থাকে ওই সীমান্তকেই। দিনের শেষে দুটো জিনিস সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দিতে না পারলে মুকিবরের পেট চলে না। যদিও মুকিবর যখন দুটাকা কিলো চালের লাইনে রোদে পুড়ছে, অরিন্দম হয়তো তখন, কোনও ভিসা অফিসের ওয়েটিং রুমে। দুজনের মধ্যে মিল একটাই, দুজনেরই একটা করে ভোট। সরকার তৈরির।

১৯ শতকের গোড়ায় স্লোগান উঠেছিল দুনিয়ার মজদুর এক হও। যে ডাক কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো হয়ে, ১৮৬৪ সালে প্রথম কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকেও গৃহিত হল। সেটাই হয়তো ছিল প্রথম বিশ্বায়নের ডাক। বলা হয়, গ্লোবালাইজেশন, এই শব্দটা ৭০-এর দশকে তাদের ক্রেডিট কার্ডের পেছনে প্রথম লিখতে শুরু করে আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক (মহাশান্তির পরে বিশ্ব-পার্থ চট্টোপাধ্যায়)। আর, কী আশ্চর্য, ওই ৭০-এর দশককেই মুক্তির দশক করার ডাক দিয়েছিলেন চারু মজুমদার। যা নিয়ে মণিভূষণ ভট্টাচার্যের কবিতা, কোথায় বিপ্লব, শুধু মরে গেল অসংখ্য হাভাতে..।

সমাজতন্ত্রের বিশ্বায়ানের ডাক গত শতকের শেষ দশকেই ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। অন্য দিকে ক্রেডিট কার্ডের সেই বিশ্বায়নের ডাকের অশ্বমেধের রথের ঘোড়াকে কেউ এখনও রুখতে পারেনি।
গ্লোবালাইজেশনের ভিতরে অদ্ভুত এক আলো- অন্ধকারে মুকিবর এবং অরিন্দম দুজনেই পথ হাঁটিতেছে। বেলা বেড়ে চলেছে।। আলোও বাড়ছে। কিন্তু অন্ধকার কমছে না!

কোনও আচ্ছে দিন, কো্নও মুক্তির দশকের ডাকই এই অন্ধকারের সমকক্ষ নয়। মেনে নেওয়াই ভাল, এই অঙ্কটা মেলেনি। এর উত্তর আমাদের জানা নেই। হল্ কালেকশন করেও অঙ্কটা মেলানো যাচ্ছে না। অথচ, অবনী বাড়ি আছো, এই কবিতা লেখার পরিপ্রেক্ষিতটাও হারিয়ে যাচ্ছে, অমলের দইওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে।
এই রকম এক সময়ে, উত্তর আসবে না জেনেও, মাঝে মাঝে কোনও এক অজানা দরজার সামনে গিয়ে ফিস ফিস করে বলতে ইচ্ছে করে, ভালোবাসা, বাড়ি আছো?

হলুদ ফুল

হলুদ ফুল 


 অনিমেষ যথেষ্ট কাজের ছেলে ছিল। বিষয়ী লোক, টাকা-পয়সার হিসেব ভালো বুঝত। ভাসানের সময় যখন সবাই সিদ্ধি খেয়ে নাচতে ব্যস্ত তখন লাইটিং-এর ভ্যান-রিক্সা ঠিক-ঠাক রাস্তা পার করানো, ট্র্যাফিক সামলানো এসবে তার আগ্রহ ও নিষ্ঠা দুটোই ছিল দেখার মত। ক্লাবের পিকনিকে মাতাল বন্ধুদের সে দায়িত্ব সহকারে বমি করাত, সামনে প্লাস্টিকের বালতি ধরত। পাড়ার ফাংশানে আর্টিস্টদের জন্য টিফিনের প্যাকেট থেকে শুরু করে ২৬শে জানুয়ারীর পতাকা-ফুলের দরদাম, অনিমেষ ছাড়া গতি ছিল না। তাই ও গাড়ী চাপা পড়ার পর আমাদের ফাইভ-এ-সাইড ফুটবল টুর্নামেন্ট ওর নামে করতে আমাদের বেশি ভাবতে হয়নি। তাছাড়া আমি হিসেব করে দেখেছিলাম ৭ নম্বর স্ট্রীটের গোপালের বাবার গায়ে আগুন লাগানোর পর অনিমেষই ছিল ফার্স্ট কেস। তার পরেও এ তল্লাটে আর কেউ অমন অপঘাতে মরেনি। সেই ৮৮’ সালেও অনিমেষের কালার ফোটো তোলানো ছিল। অতসীর জন্য। সেটা আমিই ফ্রেমে বাঁধিয়েছিলাম। চার পেয়ে কাঠের টেবিলে ফুলের মালা পরে হাসিমুখে বসে থাকে অনিমেষ প্রতি ১৫ই আগস্ট, কপালে চন্দনের ফোঁটা। ৬ বছর হয়ে গেল। এই ভাবে দুটো ওয়ার্ল্ড কাপ পার করে দিল। কে আবার ওর নামের সাথে ‘শহীদ’ জুড়ে দেওয়ায় রমরমা হয়ে যায়। ফ্রেম বাঁধানোর টাকাটা আমি অভ্যেসবশত মেরে দিয়েছিলাম। ওটা নিছকই রিফ্লেক্স। অনিমেষ ভালো বন্ধু ছিল আমার। আমি অতসীদের ভাড়াটে, আমাকে ছাড়া ওর চলত না। অতসীকে চিঠিও আমাকেই লিখতে হত। চিঠি হাত বদলও আমিই করে এসেছি বরাবর। তবে অনিমেষের মৃত্যুর খবর আমি অতসীকে দিতে পারিনি। আমি তখন দোকানে বসে। পল্টু সবার আগে অতসীর বাবাকেই খবরটা দেয়। এই একটাই সুযোগ ও পেয়েছিল অতসীদের বাড়ী ঢোকার। ওকে দোষ দিই না। আমারই কপাল খারাপ। অতসী নাকি বড়জোর সাড়ে চার সেকেন্ড হতভম্ব থেকেই কাঁদা শুরু করেছিল। পল্টুর মতে সিনেমার সাথে কিছুই মেলেনি। সিঁড়িতে ধপ করে বসেও পড়েনি অতসী। অজ্ঞান হতে হতে সন্ধ্যে হয়ে গেছিল। আমি তার বছর দুই আগে পাড়ায় আসি। আমার দোকান। অতসীর প্রেম সেবার পূজোয়। ১৯৮৮ সাল।

একটা গাছেরও নাম জানিনা। চেনা চেনা মনে হয়। কিন্তু পাতার গড়ন কেমন অচেনা। আর কত লম্বা! মাঝখানে একটা সরু নদী মত। কিন্তু জল বয় না। স্থির। নদী না খাল বলেই মনে হয়। বেশ কিছুটা হাঁটি। আমার সামনে সামনে অনিমেষ। ওর মুখ দেখা যায় না কিন্তু আমি জানি। এই জায়গায় আমি এর আগেও এসেছি। অনিমেষ এই ভাবেই আগে আগে হাঁটে। এক সময় জঙ্গল শেষ হয়ে গেলে আমরা বালিয়াড়িতে পৌঁছই। বালি বেয়ে বেয়ে উঠে আসি দুজনে। হাঁপ ধরেনি কখনো। উপরে উঠে দৃশ্যটা চেনা তবু বার বার দেখতে ভালো লাগে। চেনা চেনা গাছ। বটের মত...অশ্বত্থের মত। তারপর খাঁড়ির জল চিকচিক করে ওঠে। আবছা সমুদ্র দেখা যায়। আমার এর আগে কোনোদিন যাওয়া হয় না। এখানে অনিমেষ বসে। আমি ওর পাশে বসি। পিছনে আমাদের ফেলে আসা পায়ের ছাপগুলো আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠে। অনিমেষ হাতে ওরই ফ্রেম বাঁধানো ছবিটা নিয়ে বসে থাকে। আমার ভয় হয় এখুনি পয়সার কথাটা তুলবে। কিন্তু ও শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বলে ‘আমাকে আর একটা চিঠি লিখে দে না...’। ঠিক এইখানে প্রতিবার আমার ঘুমটা ভেঙে যায়। একটু এদিক ওদিক হয়। কোনো দিন খাঁড়ির জল থেকে পল্টু হাতে শিল্ড নিয়ে বেরিয়ে আসে। কোনো দিন অতসীর বাবা বাজারের থলি হাতে উঠে আসে। কোনো দিন অনিমেষ একটা সাদা মোষের পিঠে চেপে খাঁড়ির দিকে চলে যায়, ‘এতে চাপা পড়ার ভয় নেই’ বলতে বলতে। অতসী আসে না।

অতসী আসে না। এই পৌষের দুপুরেও ছাদে আঁচ লাগে পায়ে। হাত দিয়ে খুঁটে খুঁটে শ্যাওলা বের করি। সামনে-পাশে-পিছনের ছাদে সারি সারি জামা-কাপড় টাঙানো। কারো কার্ণিশে পায়রা, ল্যাম্পপোস্টের তারে ছেঁড়া ঘুড়ি ঝুলতে থাকে। এখন আড়াইটে হবে। সামনের বাড়ির মিলনের মা ছাদ থেকে শুকনো কাপড় তুলে নিয়ে গেল। অতসী আসে না। পায়ের তলাগুলো আঁচে চুলকোতে থাকে। ট্যাঙ্কির উপর লাল একটা ভাঙা মগ। এখানে কি করছে? কোনো কোনো দিন দুপুরে অতসী ছাদে আসে বইকি। বই-খাতা নিয়ে শতরঞ্চি পেতে বসে। রেডিও চালায় এক একদিন। ‘গুলশন কুমার পেশ করতে হ্যাঁয়’... 'কেমন আছ অতসী?’

সে শুধু মাথাটা কাত করে স্মিত হাসি দেয়। আমাকে জিজ্ঞেস করেনা আমি কেমন আছি।
‘পড়াশোনা কেমন চলছে?’
‘ভালো, সুমনদা বাবা বলছিল বাইরের বাল্বটা চেঞ্জ করে দিতে...ফিউজ হয়ে গেছে।‘
‘আচ্ছা’
আজ অতসী কোথায়? ঘরে?
ছাদ থেকে ঝুঁকে দেখতে পাই বেড়ার ধারে রাধাচূড়া গাছটার সাথে বাঁধা নাইলনের দড়ি বেয়ে লাইন দিয়ে পিঁপড়ে ঢুকছে আমার ঘরে। দড়ি বাঁধা বলে জানলাটা খোলা রাখতে হয়। এত উপর থেকে দেখা যায় না কিন্তু আমি জানি একজন আগে আগে যায় তারপর ইশারা করে বাকিদের ডাকে। আমার চিন্তা নেই। ওরা আমার ঘরে থাকেনা। আমার রান্না-বান্না, পুজো-আচ্চার বালাই নেই। ওরা আমার ঘর দিয়ে শর্টকাট মারে (অনিমেষ বলত শর্টকার্ট, বলত সিকারেট খাবি?) পিছনে মল্লিকদের রান্নাঘরে। পিঁপড়েগুলোও আমাকে ব্যাবহার করে গেল। কোনো কোনোদিন অতসীর নাইটি-সালোয়ার কি সায়া মেলা থাকে। তখন সামনের পিঁপড়েটা একটু দিশেহারা হয়ে যায়। খেই হারিয়ে ফেলে পেরোতে পেরোতে। পিছন থেকে বাকিরা আওয়াজ দেয় ‘আর কতদূর? এ কোথায় এলাম রে বাবা!’ সামনের জন হয়ত অতসীর অনেক কিছুই পার করেছে। সে প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও সামলে নেয় শেষমেশ। তুমি এখন কি করছ অতসী? আমার ভাবতে ভালো লাগে সে এখন বুকে বালিশ নিয়ে খাটে শুয়ে লিখছে কিছু। কিম্বা বাড়ীর কাজ করতে করতে গুনগুন করে গান গাইছে, পোষা বেড়ালটা পায়ে পায়ে ঘুরছে। কিম্বা আয়নার সামনে চুল বাঁধছে। কিন্তু অনিমেষ-অতসী রাজযোটক ছিল। সে নির্ঘাত বাবার পকেট থেকে টাকা সরাচ্ছে কিম্বা খাতায় এ মাসের দোকানের হিসেব টুকে রাখছে। ওইসব ভাবতে কার ভালো লাগে? অতসী আসে না। আজ আর আসবেনা। কোনোদিন অতসীর জামা-কাপড় মেলা থাকলে শুকনো কাপড়ের গন্ধ নিই। ডিটার্জেন্টের গন্ধ। অতসীর নয়। নিচে আমার দড়িতে সে আজকাল জামা-কাপড় মেলে না বড় একটা। সে খুব সুখের দিন ছিল। সরস্বতী পূজোর চাঁদা বাবদ অতসীর বাবা ৫ টাকা দেওয়ায় আর সাথে ফ্রি তে ‘সুমনের বন্ধু না হলে এটাও পেতে না’ শুনিয়ে দেওয়ায় চারটে দোপাটি আর গাঁদা ফুলের চারার সাথে সাথে অনিমেষ আমার দড়ি থেকে অতসীর ব্রা টি তুলে নিয়ে যায়। সাদা নিরীহ মধ্যবিত্ত ব্রা। অনিমেষ বলেছিল সে ওই থেকেই অতসীর প্রেমে পড়ে। লাভের লাভ আমার আর কোনোদিন অতসীর ব্রা দেখা হয়নি।


ওদের সেন্টার ফরওয়ার্ডটা বেঁটে হলেও বেশ কাজের। এই হাফটা গোটা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। একবার বারে মারল। মিলন সঙ্ঘের গোলকীপারটা বাঁচালো একটা। ওহ মিলন সঙ্ঘ। আমাদের পাড়ায় এসে তিন তিন বার শীল্ড নিয়ে গেছে শালারা। এইবার হারাতেই হবে। গোলের পিছন থেকে লাগাতার খিস্তি মেরে যাচ্ছি আমি, বুবলা আর নন্দ। আয়োজক টিম বরাবরের মত এবারো গোড়াতেই কুপোকাত। তা হোক। এবার শালা বেঁটেদের ফুল সাপোর্ট। মিলন সঙ্ঘ জিতলে আজ রাতের পার্টি ক্যান্সেল। ১-১ চলছে ৫৫ মিনিট হয়ে গেল। হাড্ডাহাড্ডি চলছে। অতসীর বাবা মঞ্চে। মাঝের চেয়ারে। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট অনাদীদা আর সেক্টরের বাবুল বোসকে দু বগলে নিয়ে। অনিমেষ না মরলে আর আমি চিঠি না লিখলে আপনাকে কেউ পুছত কাকু? তবু ফি বছর ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে। ভালোই আছে বাপ-মেয়ে। সরস্বতী-দূর্গা-কালীর চাঁদা নেই। শালপাতা ভর্তি খিচুড়ি, মিষ্টির প্যাকেট বরাদ্দ। মেয়ের দিকে কেউ নজর দেয় না। চোখ তুলে তাকায়না 'তোদের বৌদি হয় বে! আজ অনিমেষদা থাকলে'। বেঁটে গোল করল। কর্ণার থেকে জটলার মধ্যে পুক করে দিল ভরে। রেফারি বাঁশি বাজাতেই পাশের চায়ের দোকানের ডাম্বেলের মা ডেকচি মাজতে বসে গেল।

'২ টো খাম্বা নিবি আর ৪ টে বিয়ার। ৭ জন আছি...আর সতুর দোকান থেকে চিংড়ীর চপ নিয়ে নিস হিসেব মত। পোঁদটা বেরিয়ে থাকে চপের বাইরে এরকম সাইজের চিংড়ি দিতে বলবি।'
'সতু মাসিমাকে বলিস ঝাল-ফাল যেন ঠিকঠাক থাকে...'
আজ ব্যাপক মস্তি হল। চপ যা এসেছিল ২ পেগেই শেষ। তারপর কষা মাংস। জনাই মাঝখানে গিয়ে আরো ২ টো বোতল নিয়ে এলো। টুর্নামেন্টে স্পনসর যা জোটে, বছরে এই একটা দিন একদম ঝিঙ্কু বাওয়াল হয়। 'আরে গুরু সাজনের গানটা লাগাওনা... 'মেরা দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায় যো প্যায়ার ইয়ে তুমসে করতা হ্যায়'... পল্টু মাধুরি-নাচ জুড়ে দিল। 'আহ দিল খুশ করে দিল শালা ওই গ্যাঁড়াটা...বাঘবাচ্চা পুরো'। রাত দুটোর সময় বাড়ী ফিরতে ফিরতে মাথায় এলো অতসীর বাবা বোধহয় এবার ছেলে দেখবে...অনিমেষকে আমাদের কারোরই আর মনে নেই।



পেগের পর পেগ মাল টেনে যাচ্ছি আমি আর অনিমেষ। কোনো স্বাদ নেই। জল খাচ্ছি যেন। এই দিকটায় প্রথম এলাম। সমুদ্রের ধারে শালারা এমন বার লাগিয়েছে! গোল রঙ্গীন ছাতার তলায় দুজনে বসে। পাশের টেবিলে ৪ টে পিঁপড়ে। অতসীর সায়া নিয়ে গল্প করছে। তারে টাঙানো সায়ায় ভাঁজ পড়ে গেলে ডিঙোতে নাকি দম বেরিয়ে যায়। একমাত্র অনিমেষ থাকলেই আমি স্বপ্নেও বুঝতে পারি যে স্বপ্ন দেখছি। তবু যা হওয়ার হতে দিই। জোর করে কিছু পাল্টাতে যাইনা। একবার বালিয়াড়ীতে অতসীকে আনতে গিয়ে মিলনের মা চলে এসেছিল কাপড়ের বোঁচকা নিয়ে। আমি চুপচাপ মাল খেতে থাকি।
'তুই আর একটা চিঠি লেখ...লাস্ট'
আমি সমুদ্র দেখি।
'ওর শেষ চিঠিটা আমার আর পড়া হলনা'
অনিমেষ পেগ শেষ করে ঠক করে গ্লাসটা নামিয়ে রাখে।
'গ্যাঁড়াটা কি ঢোকালো...সব দেখলাম। আমার চিঠিটা দিয়েছিলি ওকে?'
আমি পিঁপড়েগুলোকে দেখি।
'দ্যাখ সুমন। তুই ছাব্বিশ টাকা ঝেড়ে দিলি ক্লাবের...আমি কিছু বলেছি? আমি রাগ করিনি মাইরি। তুই একটা লিখে দে। ওই হলুদ ফুল...নইলে ক্যাঁত করে লাথ মারব শালা' বলে অনিমেষ আমার হাঁটুতে লাথি মারতেই ঘুম ভেঙে যায়। দেখি ডান পায়ের হাঁটুর নিচটা টনটন করছে।

হলুদ ফুল হলুদ ফুল। আমার বাড়ী... আমার বাগান...আমার রাধাচূড়ার হলুদ ফুল। জুনের রাতগুলো। বাইরে ফোল্ডিং খাট পেতে শুয়ে গায়ে একটা একটা করে হলুদ ফুল এসে লাগে। একটা একটা করে হলুদ ফুল ফুটে ওঠে বিকেল হলেই এস.এন.বোস বাস স্ট্যান্ডে। আমি আর অনিমেষ বসে থাকি। বেলতলা গার্লস ছুটি হতেই সাইকেলে চেপে একটা একটা করে হলুদ ফুল ফুটতে থাকে। নীল-সাদা ইউনিফর্ম, লাল ছোট্ট লেডিজ্‌ সাইকেলে হলুদ ফুল।
'তুই একটা চিঠি লিখে দে মাইরি...আমি আর বাঁচব না'
'প্রেম করবি তুই আর চিঠি লিখব আমি? তাও অতসী? জানতে পারলে ওর বাপ বাড়ীছাড়া করবে আমায়'
'কিচ্ছু জানতে পারবেনা। তুই তো জানিস ওইসব লেখালেখি আমার দ্বারা হবেনা। একটা ওল্ড মঙ্কের বোতল নামাচ্ছি। তুই লেখ'।

তাই জুনের রাত কলম বন্দী করতেই হয়। আমার গোটা বারান্দা রাধাচূড়ায় ভরে গেছে। আমি গেট বন্ধ করতে আসি আর উপর থেকে আওয়াজ আসে 'সুমনদা'।
হলুদ নাইটিতে অতসী। আহা কি সুন্দর হাওয়া দিত তখন। মল্লিকদের রেডিওতে 'নিখিল তোমার এসেছে ছুটিয়া...মোর মাঝে আজি পড়েছে টুটিয়া হে' আমি নিচ থেকে দেখি ঝুলবারান্দায় খোলা চুলে অতসী। হলুদ নাইটির সবুজ ছিটেগুলোও যেন দেখতে পাই। ''গেট লাগিও না...বাবা এখনো ফেরেন নি।' বাবা আদৌ ফিরেছিল কিনা মনে নেই। আমার চিঠিতে অতসীর নিত্য আনাগোনা। হলুদ ফুল।


মাসের পয়লা এলে অতসীর বাবার সাথে কথা হয়।
‘আর সব ভালো তো?’
‘এবার একটা বিয়ে করো সুমন...বয়স তো পেরিয়ে যাছে।‘
‘ঘরে এখনো ছোট বোন আছে। সবই তো জানেন কাকু। আগে ওর একটা ব্যবস্থা...’
সেই গতে বাঁধা ডায়ালগবাজি। আমি চেষ্টা করি অতসী একা থাকার সময় ভাড়া দিতে যাওয়ার। অতসীর হাতে টাকা দিয়ে বলি ‘গুনে নাও’।
সে যতক্ষণ টাকা গোনে আমি দেখি। মেয়েদের শুনেছি তৃতীয় নয়ন থাকে। তবে টাকা গোনার সময় সেটা বোজা থাকে বোধহয়। অতসী পাতলা ফিনফিনে নাইটি পরে থাকলে বালিয়াড়ি পেরিয়ে খাঁড়ি থেকে সমুদ্র অবধি ঘুরে আসা যায় ওর গোনা শেষ হওয়ার আগেই। আমার সাথে ওর কিই বা কথা থাকতে পারে কেজো ছাড়া। চিঠি দিতাম যখন তখনো অতসী বিশেষ কথা বলত না। তবে দু দিন অন্তর নিজের বানানো তরকারি দিয়ে যেতো। সাথে চিঠি। সে চিঠি পড়ে আমি চিঠি লিখতে বসতাম, বাসন ধুয়ে সাথে চিঠিও দিতাম। অনিমেষ যেদিন মারা যায় সেদিন একটা চিঠি দেওয়ার ছিল। অনিমেষকে। সেটা আর দেওয়া হয়নি বলাই বাহুল্য।

‘টুকটাক কিছু দরকার পড়লে আমার দোকান থেকে নিয়ে আসতে পারো তো’ আমি সমুদ্রের হাওয়া খেতে খেতে বলি। সে ঘাড় কাত করে মাত্র,
‘ঠিক আছে...এই নোটটা চলবে তো?’
আমার দোকানে আসেনা অতসী। কোনো দরকারে বাবাকেই পাঠায় কিম্বা ওর বাবা আনিয়ে নেয়। অথচ পাশে জনাই-এর কাছ থেকে কত মরসুমি বাঁধাকপি, কচি সজনে ডাঁটা আর লাউ সে নিয়ে গেল বছরের পর বছর। দুটো ওয়ার্ল্ড কাপ পেরিয়ে গেল। অনিমেষের মাকে পূজোর দিন পাড়ার প্যান্ডেলে জড়িয়ে ধরে কি কাঁদাটাই না কাঁদলো। পাড়ার সব ছেলে-পিলেদের সামনে। সেদিন অতসী আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। ‘এইভাবে সারাটা জীবন বসে থাকিস না মা। তুই ছেলেমানুষ’ আর সাথে ‘তুমি সব সময় আমাদের বৌদি থাকবে, দরকার পড়লে একবার শুধু ডেকো’ দু-হাতে দুটো গ্র্যান্ড স্ল্যাম নিয়ে অতসী ঘরে ফিরলো...পিছনে শাল পাতার ঠোঙায় খিচুড়ি নিয়ে পল্টু।


চিঠির আইডিয়াটা আমিই দিয়েছিলাম অনিমেষকে। লিখে দিতে রাজিও হয়ে গেছিলাম এক কথায়। এমনিতে কোনো দরকার ছিলনা। অতসীর তখন এগারো ক্লাস। হপ্তায় ৭ দিনই টিউশন। আলাদা করে চিঠি না দিলেও চলত অনিমেষের। কিন্তু আমার ভালো লাগত। হলুদ ফুল মোড়া প্রথম চিঠিটা পাওয়ার ২ দিন পর বড়ি-বেগুন দিয়ে পালং শাকের সাথে অতসীর প্রথম চিঠি। ‘গুলশন কুমার পেশ করতে হ্যাঁয়’। তখনো ‘সাজন’ কি ‘দিওয়ানা’ রিলিজ করেনি। চিঠিতে যারা ছিল তাদের আমার মনেও নেই। অতসীর হাতের লেখা নকল করতে আমার দু দিন লেগেছিল। বানান ভুলগুলো ঠিক-ঠাক রপ্ত করার আগেই অনিমেষ বডি ফেলে। আমিও বেঁচে যাই। অনিমেষ যখন মারা যায় তখন স্কোর ৪-৩। অনিমেষ এক চিঠিতে এগিয়ে। অতসীকে চিঠি লিখতে বড় ভালো লাগত। কারন নিজের কথাই তো লিখতাম। কিন্তু অতসীর চিঠি? কি করে ভাবি তোমার মত? তুমি যা ভাবো তা লিখলে সুন্দর একটা জনাই-এর দোকানের ফর্দ হয়। অনিমেষ না মরলেও আমি ছেড়ে দিতাম। ওই চারটে পিঁপড়ের থেকেও খারাপ অবস্থা হয়ে গেছিল আমার।

‘অতসী যে চিঠিগুলো লিখেছিল?’
‘কি জানি কোথায়। এক জায়গায় রাখা ছিল। খুঁজে পাচ্ছিনা।‘
‘আমার পড়া হল না...কি লিখেছিল অতসী?’
‘মনে নেই। তবে গুলশন কুমার তখন আসে নি। ঋষি কাপুর কি মিঠুন। আমার ঠিক মনে নেই।‘
‘আর ওই চিঠিটা?’
‘ওটা আর শেষ করিনি। দরকার পড়লনা তো আর’
‘ওটা তাও লিখে দে সুমন’
‘তার চেয়ে বরং এটা শোন। ওর বাবা কাল সকালে বলে গেল...’,বলে আমি প্রজেক্টর চালাতে বলি। অতসী মুখে আঙুল দিয়ে ‘শশ্‌শ্‌স্‌’ করে চুপ করতে বলে পিঁপড়েগুলোকে। প্রজেক্টর অন করে।


‘এই গাছটা এবার কেটে দিতে হবে সুমন’
‘কেন কাকু? বেশ তো সুন্দর ফুল হয়’
‘হা হা ফুল হয়। তা হয়। কিন্তু প্যান্ডেল বাঁধার সময় এতটা জায়গা ছাড়া যাবে না’
‘ও’

অতসী রিল পালটায়।

‘সুমনদা বারান্দাটা ঝাঁট দাও না কেন?’
‘এই সকালে উঠে দেখি বারান্দাটা ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে অতসী’
‘শুধু শুধু নোংরা হয়। আমি মাসিকে বলে দেব। ওকে ২০ টাকা করে দিয়ে দেবে। ঘরের কিছুই তো দেখোনা। এতদিন ধরে আছ।‘
‘আচ্ছা কাল ঝাঁট দিয়ে দেব।‘
’২০ টাকা করে দিয়ে দিও...বাকি বাড়ীটা তো আমরাই করাই...’

তুই আর আসিস না অনিমেষ। কাল অনেক রাত অবধি বাইরে শুয়ে ছিলাম। টুপ টুপ করে ফুলগুলো এসে পড়ছিল এক এক করে। এই শেষবার। আমার আর ভালো লাগছে না। তুই আর আসিস না অনিমেষ। আমি মাঝে উঠে ঘর থেকে সেই আধখানা চিঠি নিয়ে এলাম। অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে শুয়ে ছিঁড়ে কুটি কুটি করলাম। আমার গায়েই এসে পড়ল এক এক করে। আমার আর ভালো লাগেনা তোর সাথে ঘুরতে, মাল খেতে। আমি অন্য কোথাও যেতে চাই এবার। চারটে পিঁপড়ে ধরাধরি করে শীল্ডটা নিয়ে টেবিল থেকে উঠে পড়ে। আমিও জানলাটা বন্ধ করে দিই।

আমি সম্ভবত কারোরই দলে না

স্লোগান জেগে উঠছে,
স্লোগান মুছে যাচ্ছে;
আমি তাকিয়ে আছি দূরে,
ইলেকট্রিকের খুঁটিতে একটি ফিঙ্গে
তাড়া করছে পাঁচ ছয়টি কাককে।

কাকগুলো পালাচ্ছে, আবার পালাচ্ছেও না,
তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছি
আমি সম্ভবত কারোরই দলে না।।

ছুটি

শেষবার তোমার হাতে হাত রেখে
আর কোনো অনুভুতি হয়নি,
তখনই বুঝে গিয়েছিলাম
এবার আমার ছুটি।

চাবি,
কোথায় জানি হারিয়ে গেছে;
মনেরঘরে এখন শুধুই তালা,
আমি জানি, এবার
তোমার অবাক হওয়ার পালা।।

Perfume: The Story of a Murderer



পৃথিবীর প্রায় সব মানুষ একই রকম – দুটো হাত, পা, চোখ, কান, নাক, মুখ – অথচ ভিন্ন তার ভাষা, কার্যাবলী। এ কারনেই কেউ হয় প্রেমিক, কেউ বা প্রেমের নিষ্ঠুরতার শিকার, কেউ যোদ্ধা, কেউ চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের শিকার। বাহিরের পার্থক্য দৃশ্যমান হলেও ভেতরের পার্থক্যটা শুধুই অনুভবের। সে পার্থক্য ইন্দ্রিয়গত হলে তো কথাই নেই।
‘পারফিউম: দ্যা স্টোরী অব আ মার্ডারার’ একটি অস্বাভাবিক প্রখর ইন্দ্রিয়ের গল্প। জার্মান লেখক প্যাট্রিক সাসকাইন্ডের বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘পারফিউম’ যা কিনা পৃথিবীর ৪৫টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে, অবলম্বনে পারফিউম মুভিটি তৈরী করেছেন পরিচালক টম টাইকার। এ গল্প জ্যা ব্যাপ্টিস্ট গ্রানুইলির যে একজন ভাগ্যাহত মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। প্যারিসের এক মাছ বাজারের মধ্যে জন্ম নেয়া গ্রানুইলিকে তার মা অনাদরে ফেলে রেখেছিল পূর্বের চার সন্তানের মতই, জন্মের পরই মারা যাবার জন্য। কিন্তু গ্রানুইলি তো অন্যদের মত নয়, তাই মরে নি বরং বেচে উঠে এক অনন্য সাধারন ঘ্রানশক্তি নিয়ে।
সুগন্ধির রাজধানী ফ্রান্সের অষ্টাদশ শতাব্দীর এক নিপুন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে মুভিতে। যেখানে পৃথিবীর সেরা সুগন্ধি তৈরী হয়, প্রতিনিয়ত হাজার হাজার লোক খেটে যায় সামান্য সুগন্ধি তৈরী করে বাতাসে ভাসিয়ে দেয়ার, সেখানে প্রবল তীক্ষ্ম এবং সামান্য পার্থক্যকে আলাদা করার ক্ষমতা সম্পন্ন গ্রানুইলিই তো যোগ্য ব্যক্তি।

পরিচালক টম টাইকার এর আগে একবার বিশ্বকে জানান দিয়েছিলেন ‘রান লোলা রান’ মুভির মাধ্যমে। আর পারফিউম মুভির মাধ্যমে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন সময় এবং স্থানের বাস্তবসম্মত উপস্থাপনে। বিশাল মাছের বাজার, প্রচুর মানুষ আর পোষাক খুব সহজেই বাস্তবে থেকেও শত বছর পিছিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

আশ্রমে বড় হওয়া গ্রানুইলিকে বিক্রি করে দেয়া হয় একজন চামড়া ব্যবসায়ীর নিকট। কঠোর পরিশ্রমে কেটে যাওয়া দিনগুলোর মধ্যেও গ্রানুইলি নিজেকে আবিস্কার করে নতুন করে – বহু দূরের, জলের তলের গন্ধও সে চিহ্নিত করতে পারে অনায়াসে। একদিন যোগাযোগ ঘটে যায় গুসেপ্পি বালদিনির সাথে যে কিনা একজন গন্ধবণিক।
শর্তসাপেক্ষে বালদিনি গ্রানুইলিকে শিখিয়ে দেয় ফুল থেকে তেল আহরনের উপায়, শিখিয়ে দেয় উপকরনের নামসমূহ আর সুগন্ধি তৈরীর উপায়। শিখতে থাকে গ্রানুইলি আর চলতে থাকে পরীক্ষা নিরিক্ষা, যদি তেরো ধরনের গন্ধ সংরক্ষন করা যায় তবে তৈরী করা সম্ভব হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুগন্ধি। তারপর একদিন সে পাড়ি জমায় গ্রাসের পথে যেখানে তৈরী হয় পৃথিবীর বিখ্যাত সুগন্ধি সমূহ।

ফুল চাষাবাদের এবং সুগন্ধি তৈরীর কার্যাবলীর একটা বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় এখানে। বিশাল বিশাল ফুলের বাগানের সকল ফুল হাজার হাজার লোকের পরিশ্রমে নানাবিধ প্রক্রিয়ার পরে তৈরী হয় সামান্য একটু তেল আর তার সাথে বিভিন্ন উপকরন নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে তৈরী হয় সুগন্ধি। সেই সুগন্ধি বিক্রি হয় সমাজের বিত্তশালী রুচিশীল ব্যক্তিদের মাঝে, সুনাম ছড়িয়ে পড়ে সুগন্ধি প্রস্তুতকারকের। আড়ালে থেকে যায় গ্রানুইলির মতো ব্যক্তিরা, জীবনের গল্পটাই এরকম।

প্রতিভাবান গ্রানুইলি সংরক্ষন করতে চায় সুন্দরী নারীর দেহের মাদকতা, আর তাই নির্বিচারে হত্যা করে যায় একের পর এক সুন্দরী নারীদের। তাদের দেহ থেকে বিচিত্র উপায়ে সংগ্রহ করে নেয়া হয় গন্ধ, যে গন্ধ এর আগে কেউ কোনদিন সংগ্রহ করতে পারেনি। আর নগ্ন লাশটি পড়ে থাকে বিভিন্ন জায়গায়। সুতরাং খোজ পড়ে যায় খুনীর যে কিনা শুধুই খুন করে কিন্তু কোন নির্যাতনের ছাপ রেখে যায় না। সবাই তটস্থ, কে বলবে পরবর্তী শিকার কে!

গ্রানুইলির চরিত্রে রূপদানকারী বেন হুইশা সম্পূর্ন চরিত্রটিকে তুলে ধরেছেন অসাধারন দক্ষতায়। একই চরিত্রে পাপহীনতা এবং নিষ্ঠুরতার বিস্ময়কর উপস্থাপন তাকে ভিন্ন রূপ দান করেছে। একবারেই নতুন বেন তার ভাঙ্গা চোয়াল, আর অবিন্যস্ত হাটাচলার মধ্য দিয়ে সেই বেনকেই তুলে ধরেছেন যা তুলে ধরেছিলেন লেখক প্যাট্রিক সাসকাইন্ড। পরিচালক টাইকার নিজেই বলেছেন নতুন এই অভিনেতা নির্বাচনের, “আমরা সেই অভিনেতাকে খুজছিলাম যে বইটির পাঠককে বিভ্রান্ত করবে না আবার নতুন দর্শককেও আকৃষ্ট করবে মূল উপন্যাসের প্রতি। বেন এ দিক থেকে সবচেয়ে যোগ্য” এ ধরনের চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা মুভিটি দেখলেই উপলব্ধি করা যায়, সম্পূর্ন মুভিটি গ্রানুইলিকে ঘিরেই আবর্তিত, বাকীরা সময়ের প্রয়োজনে এসেছে, চলেও গেছে।

গ্রানুইলি একজন প্রেমিক, কিন্তু তার নিজের কোন গন্ধ নেই, কেউ অন্যান্য সকল মানুষের মতো তাকে ভালোবাসবে না, প্রেমিক গ্রানুইলি তাই নিজের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কাজ করে যেতে থাকে। সকল উপকরন তৈরী করতে আর একটি মাত্র মেয়েকে হত্যা করলেই হয় -সে বেছে নেয় ধনাঢ্য বাবা অ্যান্টোনিও রিচির সুন্দরী মেয়ে লরাকে যে হবে তার তেরোতম উপকরন যে উপকরন সুগন্ধিকে অনন্য সাধারন করে তোলে।

তৈরী হয় শ্রেষ্ঠতম সুগন্ধি, কিন্তু ধরা পড়ে যায় গ্রানুইলি, তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার প্রস্তুতি নেয়া হয়। সারা শহর থেকে নারী পুরুষ সবাই জমায়েত হয়, তৈরীকৃত শ্রেষ্টতম সুগন্ধি নিয়ে হাজির হয় গ্রানুইলি, মাতিয়ে দেয় উপস্থিত সবাইকে। যে তৈরী করে পৃথিবীর শ্রেষ্টতম সুগন্ধি সে মানুষ নয়, অ্যান্জেল। সবাইকে মোহিত করে গ্রানুইলি হারিয়ে যায়, ফিরে যায় তার জন্মস্থানে। খালি করে দেয় বোতলের সকল সুগন্ধি, সে ঘ্রান নিতে ছুটে আসে সকল নারী পুরুষ আর সেই সুগন্ধির মধ্যেই মিশে যায় গ্রানুইলি, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুগন্ধি প্রস্তুতকারক।
২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ মুভিটি তৎকালীন সবচেয়ে ব্যয়বহুল জার্মান মুভি। ওফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ৫২০০ জন এক্সট্রা, ১০২ টি বিশাল সেট, আর ৫২০ জন টেকনিশিয়ান কাজ করেছে মুভিটির নির্মানে। আর লোকেশন নির্বাচনে ইউরোপের আটটি দেশ চষে বেড়িয়েছেন নির্মাতা। সে কারনেই হয়তো ১৪৭ মিনিটের এই মুভিটি ১২টি পুরস্কার জিতে নিয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
সবশেষে যে কথাটি না বললেই নয়, সুগন্ধিদ্রব্য তৈরীর গল্প জানতে আর সৌন্দর্যের জন্য হত্যার রোমান্টিকতাকে অনুভব করতে দেখে ফেলুন ‘মাস্ট সি’ এবং ‘অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিষিদ্ধ’ এই মুভিটি।

 ডাউনলোড লিংক

নোটবুক

দুদিন আগে খবর কাগজে দেখলাম...
সদ্যতিরোহিত কবি বলে গেছেন ... 
কবিতার প্রথম লাইন আকাশ থেকে পড়ে !
সেই থেকে অনিমেষ চেয়ে আছি 
প্রথমে উড়ে আসা খড় কুটোয় চোখ ব্যাকুল
তারপর বাবা পড়লেন ...” বিডিআর লাইন রে মা
পা চালিয়ে বেরো ... গাড়ির কি ঠিক আছে ! “
এবার আমার মন পড়ল ... মনে পড়ল ...
মা হেসে বলতো ... “ বড় দুঃখের লাইন “
পিছু পিছু নেমে এলো হেলালচাচা ...
“ দি- মণি ... আমার লগে আস ... 
ইকুলপটাশের বন দেখবা না ???? “

সে সময় বড় সহজ ছিল ... বড় সহজ ছিল সব
কবি , আজ আমায় রেহাই দাও ... আমি আবার
কবিতা থেকে বেরিয়ে এসে বলি ... “ ধ্যাত ... ইকুলপটাশ কি গো চাচা !
ওটা তো ইউক্যালিপটাস !!!!!!!!!!!!!!!!!

কাগোজের নৌকা

তার ছেঁড়া মাস্তুলে নিরুদ্দেশ পাসওয়ার্ড প্রেম
বন্দরে বন্দরে কাটাকুটি নাবিকের জং ধরা বুকে
অশরীরী আত্মার মত চোরা স্রোত উপকূল জুড়ে
তবুও সাঁঝবাতি একা বাতিঘরে কাঁপে অপেক্ষায়
পৃথিবীর গন্ধ লেগে থাকা মাটির ওপর, কবেকার
আমলকী রোদ খসে পড়েছিল তার চুলের প্রান্তে
ঠিকানা হারানো চিঠি, নোনাজলে আবছায়া চাঁদ
সেই সব কবিতারা ঘুম দেয় শেওলা গভীরে
আয়নায় টিপ হয়ে লেগে থাকা শরীরের ঘ্রান
মুক্তিপণ দাবি করে বেহিসাবি হার্মা্দের মত
সন্ধ্যাতারা বেঁচে নেওয়া ধু ধু বালি, চর, ঝাউবন
দুরত্ব ভেঙ্গে চলা...... পাশাপাশি, একাকী!

হলুদ পাখি

হলুদ পাখি

অনিমেষ যথেষ্ট কাজের ছেলে ছিল। বিষয়ী লোক, টাকা-পয়সার হিসেব ভালো বুঝত। ভাসানের সময় যখন সবাই সিদ্ধি খেয়ে নাচতে ব্যস্ত তখন লাইটিং-এর ভ্যান-রিক্সা ঠিক-ঠাক রাস্তা পার করানো, ট্র্যাফিক সামলানো এসবে তার আগ্রহ ও নিষ্ঠা দুটোই ছিল দেখার মত। ক্লাবের পিকনিকে মাতাল বন্ধুদের সে দায়িত্ব সহকারে বমি করাত, সামনে প্লাস্টিকের বালতি ধরত। পাড়ার ফাংশানে আর্টিস্টদের জন্য টিফিনের প্যাকেট থেকে শুরু করে ২৬শে জানুয়ারীর পতাকা-ফুলের দরদাম, অনিমেষ ছাড়া গতি ছিল না। তাই ও গাড়ী চাপা পড়ার পর আমাদের ফাইভ-এ-সাইড ফুটবল টুর্নামেন্ট ওর নামে করতে আমাদের বেশি ভাবতে হয়নি। তাছাড়া আমি হিসেব করে দেখেছিলাম ৭ নম্বর স্ট্রীটের গোপালের বাবার গায়ে আগুন লাগানোর পর অনিমেষই ছিল ফার্স্ট কেস। তার পরেও এ তল্লাটে আর কেউ অমন অপঘাতে মরেনি। সেই ৮৮’ সালেও অনিমেষের কালার ফোটো তোলানো ছিল। অতসীর জন্য। সেটা আমিই ফ্রেমে বাঁধিয়েছিলাম। চার পেয়ে কাঠের টেবিলে ফুলের মালা পরে হাসিমুখে বসে থাকে অনিমেষ প্রতি ১৫ই আগস্ট, কপালে চন্দনের ফোঁটা। ৬ বছর হয়ে গেল। এই ভাবে দুটো ওয়ার্ল্ড কাপ পার করে দিল। কে আবার ওর নামের সাথে ‘শহীদ’ জুড়ে দেওয়ায় রমরমা হয়ে যায়। ফ্রেম বাঁধানোর টাকাটা আমি অভ্যেসবশত মেরে দিয়েছিলাম। ওটা নিছকই রিফ্লেক্স। অনিমেষ ভালো বন্ধু ছিল আমার। আমি অতসীদের ভাড়াটে, আমাকে ছাড়া ওর চলত না। অতসীকে চিঠিও আমাকেই লিখতে হত। চিঠি হাত বদলও আমিই করে এসেছি বরাবর। তবে অনিমেষের মৃত্যুর খবর আমি অতসীকে দিতে পারিনি। আমি তখন দোকানে বসে। পল্টু সবার আগে অতসীর বাবাকেই খবরটা দেয়। এই একটাই সুযোগ ও পেয়েছিল অতসীদের বাড়ী ঢোকার। ওকে দোষ দিই না। আমারই কপাল খারাপ। অতসী নাকি বড়জোর সাড়ে চার সেকেন্ড হতভম্ব থেকেই কাঁদা শুরু করেছিল। পল্টুর মতে সিনেমার সাথে কিছুই মেলেনি। সিঁড়িতে ধপ করে বসেও পড়েনি অতসী। অজ্ঞান হতে হতে সন্ধ্যে হয়ে গেছিল। আমি তার বছর দুই আগে পাড়ায় আসি। আমার দোকান। অতসীর প্রেম সেবার পূজোয়। ১৯৮৮ সাল।

একটা গাছেরও নাম জানিনা। চেনা চেনা মনে হয়। কিন্তু পাতার গড়ন কেমন অচেনা। আর কত লম্বা! মাঝখানে একটা সরু নদী মত। কিন্তু জল বয় না। স্থির। নদী না খাল বলেই মনে হয়। বেশ কিছুটা হাঁটি। আমার সামনে সামনে অনিমেষ। ওর মুখ দেখা যায় না কিন্তু আমি জানি। এই জায়গায় আমি এর আগেও এসেছি। অনিমেষ এই ভাবেই আগে আগে হাঁটে। এক সময় জঙ্গল শেষ হয়ে গেলে আমরা বালিয়াড়িতে পৌঁছই। বালি বেয়ে বেয়ে উঠে আসি দুজনে। হাঁপ ধরেনি কখনো। উপরে উঠে দৃশ্যটা চেনা তবু বার বার দেখতে ভালো লাগে। চেনা চেনা গাছ। বটের মত...অশ্বত্থের মত। তারপর খাঁড়ির জল চিকচিক করে ওঠে। আবছা সমুদ্র দেখা যায়। আমার এর আগে কোনোদিন যাওয়া হয় না। এখানে অনিমেষ বসে। আমি ওর পাশে বসি। পিছনে আমাদের ফেলে আসা পায়ের ছাপগুলো আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠে। অনিমেষ হাতে ওরই ফ্রেম বাঁধানো ছবিটা নিয়ে বসে থাকে। আমার ভয় হয় এখুনি পয়সার কথাটা তুলবে। কিন্তু ও শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বলে ‘আমাকে আর একটা চিঠি লিখে দে না...’। ঠিক এইখানে প্রতিবার আমার ঘুমটা ভেঙে যায়। একটু এদিক ওদিক হয়। কোনো দিন খাঁড়ির জল থেকে পল্টু হাতে শিল্ড নিয়ে বেরিয়ে আসে। কোনো দিন অতসীর বাবা বাজারের থলি হাতে উঠে আসে। কোনো দিন অনিমেষ একটা সাদা মোষের পিঠে চেপে খাঁড়ির দিকে চলে যায়, ‘এতে চাপা পড়ার ভয় নেই’ বলতে বলতে। অতসী আসে না।

অতসী আসে না। এই পৌষের দুপুরেও ছাদে আঁচ লাগে পায়ে। হাত দিয়ে খুঁটে খুঁটে শ্যাওলা বের করি। সামনে-পাশে-পিছনের ছাদে সারি সারি জামা-কাপড় টাঙানো। কারো কার্ণিশে পায়রা, ল্যাম্পপোস্টের তারে ছেঁড়া ঘুড়ি ঝুলতে থাকে। এখন আড়াইটে হবে। সামনের বাড়ির মিলনের মা ছাদ থেকে শুকনো কাপড় তুলে নিয়ে গেল। অতসী আসে না। পায়ের তলাগুলো আঁচে চুলকোতে থাকে। ট্যাঙ্কির উপর লাল একটা ভাঙা মগ। এখানে কি করছে? কোনো কোনো দিন দুপুরে অতসী ছাদে আসে বইকি। বই-খাতা নিয়ে শতরঞ্চি পেতে বসে। রেডিও চালায় এক একদিন। ‘গুলশন কুমার পেশ করতে হ্যাঁয়’... 'কেমন আছ অতসী?’

সে শুধু মাথাটা কাত করে স্মিত হাসি দেয়। আমাকে জিজ্ঞেস করেনা আমি কেমন আছি।
‘পড়াশোনা কেমন চলছে?’
‘ভালো, সুমনদা বাবা বলছিল বাইরের বাল্বটা চেঞ্জ করে দিতে...ফিউজ হয়ে গেছে।‘
‘আচ্ছা’
আজ অতসী কোথায়? ঘরে?
ছাদ থেকে ঝুঁকে দেখতে পাই বেড়ার ধারে রাধাচূড়া গাছটার সাথে বাঁধা নাইলনের দড়ি বেয়ে লাইন দিয়ে পিঁপড়ে ঢুকছে আমার ঘরে। দড়ি বাঁধা বলে জানলাটা খোলা রাখতে হয়। এত উপর থেকে দেখা যায় না কিন্তু আমি জানি একজন আগে আগে যায় তারপর ইশারা করে বাকিদের ডাকে। আমার চিন্তা নেই। ওরা আমার ঘরে থাকেনা। আমার রান্না-বান্না, পুজো-আচ্চার বালাই নেই। ওরা আমার ঘর দিয়ে শর্টকাট মারে (অনিমেষ বলত শর্টকার্ট, বলত সিকারেট খাবি?) পিছনে মল্লিকদের রান্নাঘরে। পিঁপড়েগুলোও আমাকে ব্যাবহার করে গেল। কোনো কোনোদিন অতসীর নাইটি-সালোয়ার কি সায়া মেলা থাকে। তখন সামনের পিঁপড়েটা একটু দিশেহারা হয়ে যায়। খেই হারিয়ে ফেলে পেরোতে পেরোতে। পিছন থেকে বাকিরা আওয়াজ দেয় ‘আর কতদূর? এ কোথায় এলাম রে বাবা!’ সামনের জন হয়ত অতসীর অনেক কিছুই পার করেছে। সে প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও সামলে নেয় শেষমেশ। তুমি এখন কি করছ অতসী? আমার ভাবতে ভালো লাগে সে এখন বুকে বালিশ নিয়ে খাটে শুয়ে লিখছে কিছু। কিম্বা বাড়ীর কাজ করতে করতে গুনগুন করে গান গাইছে, পোষা বেড়ালটা পায়ে পায়ে ঘুরছে। কিম্বা আয়নার সামনে চুল বাঁধছে। কিন্তু অনিমেষ-অতসী রাজযোটক ছিল। সে নির্ঘাত বাবার পকেট থেকে টাকা সরাচ্ছে কিম্বা খাতায় এ মাসের দোকানের হিসেব টুকে রাখছে। ওইসব ভাবতে কার ভালো লাগে? অতসী আসে না। আজ আর আসবেনা। কোনোদিন অতসীর জামা-কাপড় মেলা থাকলে শুকনো কাপড়ের গন্ধ নিই। ডিটার্জেন্টের গন্ধ। অতসীর নয়। নিচে আমার দড়িতে সে আজকাল জামা-কাপড় মেলে না বড় একটা। সে খুব সুখের দিন ছিল। সরস্বতী পূজোর চাঁদা বাবদ অতসীর বাবা ৫ টাকা দেওয়ায় আর সাথে ফ্রি তে ‘সুমনের বন্ধু না হলে এটাও পেতে না’ শুনিয়ে দেওয়ায় চারটে দোপাটি আর গাঁদা ফুলের চারার সাথে সাথে অনিমেষ আমার দড়ি থেকে অতসীর ব্রা টি তুলে নিয়ে যায়। সাদা নিরীহ মধ্যবিত্ত ব্রা। অনিমেষ বলেছিল সে ওই থেকেই অতসীর প্রেমে পড়ে। লাভের লাভ আমার আর কোনোদিন অতসীর ব্রা দেখা হয়নি।


ওদের সেন্টার ফরওয়ার্ডটা বেঁটে হলেও বেশ কাজের। এই হাফটা গোটা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। একবার বারে মারল। মিলন সঙ্ঘের গোলকীপারটা বাঁচালো একটা। ওহ মিলন সঙ্ঘ। আমাদের পাড়ায় এসে তিন তিন বার শীল্ড নিয়ে গেছে শালারা। এইবার হারাতেই হবে। গোলের পিছন থেকে লাগাতার খিস্তি মেরে যাচ্ছি আমি, বুবলা আর নন্দ। আয়োজক টিম বরাবরের মত এবারো গোড়াতেই কুপোকাত। তা হোক। এবার শালা বেঁটেদের ফুল সাপোর্ট। মিলন সঙ্ঘ জিতলে আজ রাতের পার্টি ক্যান্সেল। ১-১ চলছে ৫৫ মিনিট হয়ে গেল। হাড্ডাহাড্ডি চলছে। অতসীর বাবা মঞ্চে। মাঝের চেয়ারে। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট অনাদীদা আর সেক্টরের বাবুল বোসকে দু বগলে নিয়ে। অনিমেষ না মরলে আর আমি চিঠি না লিখলে আপনাকে কেউ পুছত কাকু? তবু ফি বছর ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে। ভালোই আছে বাপ-মেয়ে। সরস্বতী-দূর্গা-কালীর চাঁদা নেই। শালপাতা ভর্তি খিচুড়ি, মিষ্টির প্যাকেট বরাদ্দ। মেয়ের দিকে কেউ নজর দেয় না। চোখ তুলে তাকায়না 'তোদের বৌদি হয় বে! আজ অনিমেষদা থাকলে'। বেঁটে গোল করল। কর্ণার থেকে জটলার মধ্যে পুক করে দিল ভরে। রেফারি বাঁশি বাজাতেই পাশের চায়ের দোকানের ডাম্বেলের মা ডেকচি মাজতে বসে গেল।

'২ টো খাম্বা নিবি আর ৪ টে বিয়ার। ৭ জন আছি...আর সতুর দোকান থেকে চিংড়ীর চপ নিয়ে নিস হিসেব মত। পোঁদটা বেরিয়ে থাকে চপের বাইরে এরকম সাইজের চিংড়ি দিতে বলবি।'
'সতু মাসিমাকে বলিস ঝাল-ফাল যেন ঠিকঠাক থাকে...'
আজ ব্যাপক মস্তি হল। চপ যা এসেছিল ২ পেগেই শেষ। তারপর কষা মাংস। জনাই মাঝখানে গিয়ে আরো ২ টো বোতল নিয়ে এলো। টুর্নামেন্টে স্পনসর যা জোটে, বছরে এই একটা দিন একদম ঝিঙ্কু বাওয়াল হয়। 'আরে গুরু সাজনের গানটা লাগাওনা... 'মেরা দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায় যো প্যায়ার ইয়ে তুমসে করতা হ্যায়'... পল্টু মাধুরি-নাচ জুড়ে দিল। 'আহ দিল খুশ করে দিল শালা ওই গ্যাঁড়াটা...বাঘবাচ্চা পুরো'। রাত দুটোর সময় বাড়ী ফিরতে ফিরতে মাথায় এলো অতসীর বাবা বোধহয় এবার ছেলে দেখবে...অনিমেষকে আমাদের কারোরই আর মনে নেই।



পেগের পর পেগ মাল টেনে যাচ্ছি আমি আর অনিমেষ। কোনো স্বাদ নেই। জল খাচ্ছি যেন। এই দিকটায় প্রথম এলাম। সমুদ্রের ধারে শালারা এমন বার লাগিয়েছে! গোল রঙ্গীন ছাতার তলায় দুজনে বসে। পাশের টেবিলে ৪ টে পিঁপড়ে। অতসীর সায়া নিয়ে গল্প করছে। তারে টাঙানো সায়ায় ভাঁজ পড়ে গেলে ডিঙোতে নাকি দম বেরিয়ে যায়। একমাত্র অনিমেষ থাকলেই আমি স্বপ্নেও বুঝতে পারি যে স্বপ্ন দেখছি। তবু যা হওয়ার হতে দিই। জোর করে কিছু পাল্টাতে যাইনা। একবার বালিয়াড়ীতে অতসীকে আনতে গিয়ে মিলনের মা চলে এসেছিল কাপড়ের বোঁচকা নিয়ে। আমি চুপচাপ মাল খেতে থাকি।
'তুই আর একটা চিঠি লেখ...লাস্ট'
আমি সমুদ্র দেখি।
'ওর শেষ চিঠিটা আমার আর পড়া হলনা'
অনিমেষ পেগ শেষ করে ঠক করে গ্লাসটা নামিয়ে রাখে।
'গ্যাঁড়াটা কি ঢোকালো...সব দেখলাম। আমার চিঠিটা দিয়েছিলি ওকে?'
আমি পিঁপড়েগুলোকে দেখি।
'দ্যাখ সুমন। তুই ছাব্বিশ টাকা ঝেড়ে দিলি ক্লাবের...আমি কিছু বলেছি? আমি রাগ করিনি মাইরি। তুই একটা লিখে দে। ওই হলুদ ফুল...নইলে ক্যাঁত করে লাথ মারব শালা' বলে অনিমেষ আমার হাঁটুতে লাথি মারতেই ঘুম ভেঙে যায়। দেখি ডান পায়ের হাঁটুর নিচটা টনটন করছে।

হলুদ ফুল হলুদ ফুল। আমার বাড়ী... আমার বাগান...আমার রাধাচূড়ার হলুদ ফুল। জুনের রাতগুলো। বাইরে ফোল্ডিং খাট পেতে শুয়ে গায়ে একটা একটা করে হলুদ ফুল এসে লাগে। একটা একটা করে হলুদ ফুল ফুটে ওঠে বিকেল হলেই এস.এন.বোস বাস স্ট্যান্ডে। আমি আর অনিমেষ বসে থাকি। বেলতলা গার্লস ছুটি হতেই সাইকেলে চেপে একটা একটা করে হলুদ ফুল ফুটতে থাকে। নীল-সাদা ইউনিফর্ম, লাল ছোট্ট লেডিজ্‌ সাইকেলে হলুদ ফুল।
'তুই একটা চিঠি লিখে দে মাইরি...আমি আর বাঁচব না'
'প্রেম করবি তুই আর চিঠি লিখব আমি? তাও অতসী? জানতে পারলে ওর বাপ বাড়ীছাড়া করবে আমায়'
'কিচ্ছু জানতে পারবেনা। তুই তো জানিস ওইসব লেখালেখি আমার দ্বারা হবেনা। একটা ওল্ড মঙ্কের বোতল নামাচ্ছি। তুই লেখ'।

তাই জুনের রাত কলম বন্দী করতেই হয়। আমার গোটা বারান্দা রাধাচূড়ায় ভরে গেছে। আমি গেট বন্ধ করতে আসি আর উপর থেকে আওয়াজ আসে 'সুমনদা'।
হলুদ নাইটিতে অতসী। আহা কি সুন্দর হাওয়া দিত তখন। মল্লিকদের রেডিওতে 'নিখিল তোমার এসেছে ছুটিয়া...মোর মাঝে আজি পড়েছে টুটিয়া হে' আমি নিচ থেকে দেখি ঝুলবারান্দায় খোলা চুলে অতসী। হলুদ নাইটির সবুজ ছিটেগুলোও যেন দেখতে পাই। ''গেট লাগিও না...বাবা এখনো ফেরেন নি।' বাবা আদৌ ফিরেছিল কিনা মনে নেই। আমার চিঠিতে অতসীর নিত্য আনাগোনা। হলুদ ফুল।


মাসের পয়লা এলে অতসীর বাবার সাথে কথা হয়।
‘আর সব ভালো তো?’
‘এবার একটা বিয়ে করো সুমন...বয়স তো পেরিয়ে যাছে।‘
‘ঘরে এখনো ছোট বোন আছে। সবই তো জানেন কাকু। আগে ওর একটা ব্যবস্থা...’
সেই গতে বাঁধা ডায়ালগবাজি। আমি চেষ্টা করি অতসী একা থাকার সময় ভাড়া দিতে যাওয়ার। অতসীর হাতে টাকা দিয়ে বলি ‘গুনে নাও’।
সে যতক্ষণ টাকা গোনে আমি দেখি। মেয়েদের শুনেছি তৃতীয় নয়ন থাকে। তবে টাকা গোনার সময় সেটা বোজা থাকে বোধহয়। অতসী পাতলা ফিনফিনে নাইটি পরে থাকলে বালিয়াড়ি পেরিয়ে খাঁড়ি থেকে সমুদ্র অবধি ঘুরে আসা যায় ওর গোনা শেষ হওয়ার আগেই। আমার সাথে ওর কিই বা কথা থাকতে পারে কেজো ছাড়া। চিঠি দিতাম যখন তখনো অতসী বিশেষ কথা বলত না। তবে দু দিন অন্তর নিজের বানানো তরকারি দিয়ে যেতো। সাথে চিঠি। সে চিঠি পড়ে আমি চিঠি লিখতে বসতাম, বাসন ধুয়ে সাথে চিঠিও দিতাম। অনিমেষ যেদিন মারা যায় সেদিন একটা চিঠি দেওয়ার ছিল। অনিমেষকে। সেটা আর দেওয়া হয়নি বলাই বাহুল্য।

‘টুকটাক কিছু দরকার পড়লে আমার দোকান থেকে নিয়ে আসতে পারো তো’ আমি সমুদ্রের হাওয়া খেতে খেতে বলি। সে ঘাড় কাত করে মাত্র,
‘ঠিক আছে...এই নোটটা চলবে তো?’
আমার দোকানে আসেনা অতসী। কোনো দরকারে বাবাকেই পাঠায় কিম্বা ওর বাবা আনিয়ে নেয়। অথচ পাশে জনাই-এর কাছ থেকে কত মরসুমি বাঁধাকপি, কচি সজনে ডাঁটা আর লাউ সে নিয়ে গেল বছরের পর বছর। দুটো ওয়ার্ল্ড কাপ পেরিয়ে গেল। অনিমেষের মাকে পূজোর দিন পাড়ার প্যান্ডেলে জড়িয়ে ধরে কি কাঁদাটাই না কাঁদলো। পাড়ার সব ছেলে-পিলেদের সামনে। সেদিন অতসী আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। ‘এইভাবে সারাটা জীবন বসে থাকিস না মা। তুই ছেলেমানুষ’ আর সাথে ‘তুমি সব সময় আমাদের বৌদি থাকবে, দরকার পড়লে একবার শুধু ডেকো’ দু-হাতে দুটো গ্র্যান্ড স্ল্যাম নিয়ে অতসী ঘরে ফিরলো...পিছনে শাল পাতার ঠোঙায় খিচুড়ি নিয়ে পল্টু।


চিঠির আইডিয়াটা আমিই দিয়েছিলাম অনিমেষকে। লিখে দিতে রাজিও হয়ে গেছিলাম এক কথায়। এমনিতে কোনো দরকার ছিলনা। অতসীর তখন এগারো ক্লাস। হপ্তায় ৭ দিনই টিউশন। আলাদা করে চিঠি না দিলেও চলত অনিমেষের। কিন্তু আমার ভালো লাগত। হলুদ ফুল মোড়া প্রথম চিঠিটা পাওয়ার ২ দিন পর বড়ি-বেগুন দিয়ে পালং শাকের সাথে অতসীর প্রথম চিঠি। ‘গুলশন কুমার পেশ করতে হ্যাঁয়’। তখনো ‘সাজন’ কি ‘দিওয়ানা’ রিলিজ করেনি। চিঠিতে যারা ছিল তাদের আমার মনেও নেই। অতসীর হাতের লেখা নকল করতে আমার দু দিন লেগেছিল। বানান ভুলগুলো ঠিক-ঠাক রপ্ত করার আগেই অনিমেষ বডি ফেলে। আমিও বেঁচে যাই। অনিমেষ যখন মারা যায় তখন স্কোর ৪-৩। অনিমেষ এক চিঠিতে এগিয়ে। অতসীকে চিঠি লিখতে বড় ভালো লাগত। কারন নিজের কথাই তো লিখতাম। কিন্তু অতসীর চিঠি? কি করে ভাবি তোমার মত? তুমি যা ভাবো তা লিখলে সুন্দর একটা জনাই-এর দোকানের ফর্দ হয়। অনিমেষ না মরলেও আমি ছেড়ে দিতাম। ওই চারটে পিঁপড়ের থেকেও খারাপ অবস্থা হয়ে গেছিল আমার।

‘অতসী যে চিঠিগুলো লিখেছিল?’
‘কি জানি কোথায়। এক জায়গায় রাখা ছিল। খুঁজে পাচ্ছিনা।‘
‘আমার পড়া হল না...কি লিখেছিল অতসী?’
‘মনে নেই। তবে গুলশন কুমার তখন আসে নি। ঋষি কাপুর কি মিঠুন। আমার ঠিক মনে নেই।‘
‘আর ওই চিঠিটা?’
‘ওটা আর শেষ করিনি। দরকার পড়লনা তো আর’
‘ওটা তাও লিখে দে সুমন’
‘তার চেয়ে বরং এটা শোন। ওর বাবা কাল সকালে বলে গেল...’,বলে আমি প্রজেক্টর চালাতে বলি। অতসী মুখে আঙুল দিয়ে ‘শশ্‌শ্‌স্‌’ করে চুপ করতে বলে পিঁপড়েগুলোকে। প্রজেক্টর অন করে।


‘এই গাছটা এবার কেটে দিতে হবে সুমন’
‘কেন কাকু? বেশ তো সুন্দর ফুল হয়’
‘হা হা ফুল হয়। তা হয়। কিন্তু প্যান্ডেল বাঁধার সময় এতটা জায়গা ছাড়া যাবে না’
‘ও’

অতসী রিল পালটায়।

‘সুমনদা বারান্দাটা ঝাঁট দাও না কেন?’
‘এই সকালে উঠে দেখি বারান্দাটা ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে অতসী’
‘শুধু শুধু নোংরা হয়। আমি মাসিকে বলে দেব। ওকে ২০ টাকা করে দিয়ে দেবে। ঘরের কিছুই তো দেখোনা। এতদিন ধরে আছ।‘
‘আচ্ছা কাল ঝাঁট দিয়ে দেব।‘
’২০ টাকা করে দিয়ে দিও...বাকি বাড়ীটা তো আমরাই করাই...’

তুই আর আসিস না অনিমেষ। কাল অনেক রাত অবধি বাইরে শুয়ে ছিলাম। টুপ টুপ করে ফুলগুলো এসে পড়ছিল এক এক করে। এই শেষবার। আমার আর ভালো লাগছে না। তুই আর আসিস না অনিমেষ। আমি মাঝে উঠে ঘর থেকে সেই আধখানা চিঠি নিয়ে এলাম। অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে শুয়ে ছিঁড়ে কুটি কুটি করলাম। আমার গায়েই এসে পড়ল এক এক করে। আমার আর ভালো লাগেনা তোর সাথে ঘুরতে, মাল খেতে। আমি অন্য কোথাও যেতে চাই এবার। চারটে পিঁপড়ে ধরাধরি করে শীল্ডটা নিয়ে টেবিল থেকে উঠে পড়ে। আমিও জানলাটা বন্ধ করে দিই।

তোমায় নিয়ে

দিনের মধ্যে হাজারটা কাজ আর ব্যস্ততা
প্রেমের কথা? সেসব কবেই হয়েছে শেষ
অলস দুপুর, কফির কাপের উষ্ণতায়
দু একটা ফোন, খুচরো কিছু এস.এম.এস

এরপরে সেই ফুরিয়ে যাওয়া চারমিনার
জুতোয় পিষে রাস্তা হাঁটি, মফস্বল
কলেজ, ট্র্যাফিক, আড্ডা, হাসি, ক্যান্টিন আর
গেটের কাছে ভীড় বাড়ানো মেয়ের দল

সন্ধ্যে ঘনায়, আছড়ে পড়ে বৃষ্টি, মেঘ
পোশাক বাঁচাই, দাম যতই সস্তা নিক
জলজমা রাত গলায় ঢালে উনিশ পেগ
মদ অথবা বুড়িয়ে যাওয়া মস্তানি

শহর ঘুমায়, আজান শুনি চারটে বাইশ
নেশায় মাখা বালিশ, কাথা, হাতের ছাপ
চোখের পাতা পর্দা টানে, হিপনোটাইজ
স্বপ্ন আসুক, রঙ্গীন খাতায় অটোগ্রাফ

তারপরে সেই ঘুরতে থাকে খুড়োর কল
তোমার খেয়াল কোথায় বা পায় আস্তানা
দিন আসে যায়, সমুদ্র ছোঁয় নদীর জল
প্রেম ভুলে যায় তোমার আষিক – মাস্তানা

তবুও হটাৎ কাজের ফাঁকে তোমার ফোন
গুছিয়ে তোলে শরীর মনের স্ট্যাক এন কিউ
ক্লীশেড প্রেমের বস্তাপচা ডায়াল টোন
“কি করছ?
````````` মিস ইউ আ লট...
`````````````````````আই লাভ ইউ..”.

আমার রাতেরা কেবলই শেষ হয়ে যায়

কাল ভোরে রোদের আগে উঠবো বলে আজ 
ছেলেরা অল্প শীতে উষ্ণ কম্বলের 
নিচে জানি মাথা রাখছে না আলস্যে। 

হয়তবা ঈশ্বরের উপর 
হারিয়ে ফেলা বিশ্বাসের 
সাথে হারিয়ে যাওয়া 'ভয়' নামক 
অনুভূতি খোঁজার জন্যে এভিল ডেথ 
দেখতে বসেছে বাতি নিভিয়ে। 

আগামীকাল তো ছুটি............ 

অচেনা মেয়েটা জানি নিদারুণ অপচয় 
করে চলেছে, দামী কিছু 
নোনতা জলের। 

কয়েদী হয়ে বেঁচে থাকা শরীর, 
তার ভীতরে আঁটকে থাকা মনের 
তৈরি বিষাক্ত 
জল বেরিয়ে যাচ্ছে চোখ দিয়ে, 
ফিনফিনে পাতলা টি-শার্ট টেনে তাই 
মুছতে ব্যস্ত এই অন্ধকারের 
আড়ালে সে। 

দুঃখরা বড় অবুঝ 
হয়,কুড়ে কুড়ে সুখ খায় , 
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। 
ঠিক যেমন অতি আদরের সন্তানদের 
উপর অবুঝের মতোই অত্যাচার 
করে চলে প্রতিনিয়তই, কিছু 
দায়িত্ববান অবুঝ প্রাণী। 

ভালোবাসার শহরে থাকা মেয়েটা, 
জানালার সাটার নামিয়ে অন্ধকার 
ঘরে আলো খোঁজে এমোলেড ডিসপ্লেতে, 
ওয়াই-ফায়ের 
কানেকশনে চলতে থাকা চ্যাট 
বক্সে,অপরিচিত নষ্ট চরিত্রের কোন এক 
ছেলের সাথে। 

সে বাহিরে এসে ভালোবাসার শহর 
দেখেনি, নিজের মত করে। 
তবে বস্তির ঝুপড়ী ঘর আর এই 
দামী শহরের দামী ফ্ল্যাটে থাকার 
পার্থক্য কই বুঝল সে ? 

মেয়েটা বেঁচে থাকে বাঁচার জন্যে। 
যার সাথে তাঁর হচ্ছে ভাবপ্রকাশ, 
সে উন্মাদ ছেলেটা 'বেঁচে থাকে, 
সুখের শেষটা সে দেখবে বলে' 
ভবিষ্যৎ বলতে পারা টিকটিকির লেজ 
পুড়িয়ে তৈরি করা আর্টিফিশিয়াল 
হ্যালুসিনেশনে তোমাদের রাত কেমন 
কাটে আমি জানি না। 

কিংবা হিটলারের সৈন্যদের 
শক্তি যোগানোর 
জন্যে তৈরি মেথঅ্যাম্ফিটামিন ও 
ক্যাফেইন মিশ্রণে লাল রঙের 
ইয়াবা পুড়িয়ে জেগে থাকা রাত 
তোমাদের কেমন কাটে আমি জানি না। 

গতবছর শীত 
শেষে হারিয়ে যাওয়া ছেলে গুলোর 
সাথে হারিয়ে যাওয়া সময়ে স্মৃতিচারণ 
করতে গিয়ে বিছানার 
পাশে রাখা গতরাতের কলার 
খোসাতে পচন ধরেছে বুঝতে পারছি আজ, 
কেমন জানি পরিচিত এক 
বিদঘুটে গন্ধে। 

উচ্চ ধারার সুখাদ্য টাইপ সাহিত্যের 
জন্ম দিতে নই,সস্তা কথা গুলো বলেতেই 
আমার রাতেরা শেষ হয়ে যায়…

তুমি আর তোমার সরাইখানা

সমস্ত হারিয়ে ফেলবার মধ্যে এক পাওয়া আছে; 

সব ফেলে আসবার মধ্যে কিছু নিয়ে আসা আছে, 
ঠিক বোঝানো যায় না। 

এই যে সারা আকাশময় ছড়িয়ে আছে তোমার 
চোখের জল, 
আর আমরা বাড়িয়ে দিচ্ছি আমাদের হাত 
এক প্রাপ্তি ঘটে যাচ্ছে কোথাও; 

ঠিক বোঝানো যাচ্ছে না।

বিষন্ন বিকেল আর ছন্নছাড়া মেঘ

আজকাল প্রায়ই আমার কোন কারণ ছাড়া বিষণ্ন লাগে। ছন্নছাড়া মেঘের মত বিষণ্ণ লাগে, একলা চিলের মত বিষণ্ণ লাগে, নিশ্চুপ পাহাড়ের মত বিষণ্ন লাগে। বৃষ্টিধোয়া বিকেলে ঠিক তোমারই মত আমারও বিষণ্ন আর একা লাগে। তোমারও কি কখনো এমন হয়? যখন তুমি ক্লাসে অন্য সবার মত একজন হয়ে উঠতে পার না? যখন স্কুলজীবনের মত ভাল ফলাফল করে রেজাল্ট কার্ডটা বাবা-মায়ের  হাতে তুলে দিতে পার না আর তাদের চোখে চিকচিক করে জ্বলতে থাকা আনন্দের জলটুকু দেখতে পাও না? ভালোবাসার মানুষটি কি তোমাকেও কষ্ট দিয়ে চলে যায়? প্রিয় বন্ধুরা কি ভুল করে তোমায় ফেলে আড্ডায় মেতে ওঠে? কাছের মানুষগুলো কি তোমার পেছনে অনবরত তোমায় নিয়েই ব্যঙ্গ করে? পরিবারের একান্ত মানুষগুলো কি তোমায় বুঝতে পারে না কিংবা বুঝলেও ভুল বোঝে? তোমার সহোদরও কি তোমারই সামনে ভুল পথে হেঁটে যায়?
আজকাল প্রায়ই আমার কোন কারণ ছাড়া বিষণ্ন লাগে। তোমার মত ঐ বিমর্ষ একাকী কষ্টের কারণগুলোকে যে আমি কারণ বলেই মনে করি না! তাই আজকাল আমার কোন কারণ ছাড়াই বড্ড একা আর বিষণ্ন লাগে। মনে হয় এই পৃথিবীর বৃত্ত জুড়ে কেবল আমি একা বসবাস করছি। আমি- এমন একজন যে শূন্য, রিক্ত। হয়ত আমাকে সবাই দেখতে পায় তবু জানি আমি শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নই।

“বড় একা আমি
নিজের ছায়ার মত
শূন্যতার মত
দীর্ঘশ্বাসের মত
নিঃসঙ্গ বৃক্ষের মত
নির্জন নদীর মত
বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত
মৌন পাহাড়ের মত
আজীবন সাজাপ্রাপ্ত দন্ডপ্রাপ্ত আসামির মত
বড় একা আমি, বড় একা “

আমি জানি, তোমার আর আমার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। কারণ কম-বেশি আমরা সবাই নিজের থেকে বিছিন্ন, নিঃস্ব হয়ে বেঁচে থাকি। নিজেকে নিয়ত ভাঙ্গি-গড়ি; সমস্ত কষ্ট, না পাওয়ার আড়ালে নিজেকে প্রবোধ দেই। নিজের কাছে নিজেকে শতেকবার বিক্রি করি আবার সস্তায় বিক্রি হয়ে যাওয়া পুরনো সেই আমিকে কিনে নেই নতুন করে।
আমি জানি, তুমি বারবার চিন্তা কর নতুন কোন কষ্টে আর নিজেকে জড়াবে না, কারো অবহেলায় দুঃখ পাবে না, নিজের হীনমণ্যতায় আর একাকী কাঁদবে না। তবু তুমি কষ্ট পাও, দুঃখ পাও, একাকী কাঁদ কেননা তুমি চেষ্টা করেও তোমার চোখের সামনে নতুন কোন ছবি আঁকতে পার না। কারণ সবাই তোমায় বলে যে তোমাকে অন্যদের মত জনপ্রিয় হতে হবে, সুন্দর হতে হবে, তোমাকে দামী কসমেটিকস ব্যবহার করতে হবে, এমনকি প্রয়োজনে সার্জারিও করাতে হবে। তোমাকে সবাই বলে যে তোমায় স্লিম হতে হবে, আকর্শনীয় পোশাক পরে ফেসবুকে চমৎকার সব প্রোফাইল পিকচার দিতে হবে। তারপর ধুন্ধুমার সব স্ট্যাটাস দিয়ে অজস্র মানুষের লাইক পেতে হবে। তোমার পরিবারেও ঠিক তাই ঘটে। সবাই বলে যে তোমাকে ঐ আত্মীয়ের মত সর্বগুনে গুনান্বিত আর চটপটে হতে হবে। সর্বোপরি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমাকে মানুষের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে হবে।

কিন্তু জানো, তোমার চারপাশে এঁকে দেয়া এই ছবিটাই ভুল, কেবল মায়াজাল মাত্র। এই ছবির বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে তুমি প্রতিদিন আরও ক্লান্ত হয়ে পড়বে, হেরে যেতে থাকবে, ছবির মত হতে না পারার অসহায়ত্ব তোমাকে কুরে কুরে খাবে।
আজকাল প্রায়ই আমার কোন কারণ ছাড়া বিষণ্ন লাগে। বিষণ্ন হবার মত কোন কারণ আজ আর আমি খুঁজে পাই না, যেমন করে তুমি কিংবা তোমরা পাও। কারণ আমি অন্য কারো কথাকে, সিস্টেমের এঁকে দেয়া প্রোগ্রাম করা পুরো ছবিটাকে আজ আর পাত্তা দেই না। হয়ত তোমার মনে হতে পারে যে এই অভ্যাস তৈরি করার জন্য প্রচণ্ড মানসিক শক্তির প্রয়োজন। কিন্তু আদতে তা নয়, তোমাকে শুধু বুঝে নিতে হবে দুর্ভাগ্যবশত বেশিরভাগ মানুষের ভেতর সতেচনতাবোধের অভাব থাকে। তোমার শুধু মনে রাখতে হবে যে তোমার জীবনে আরো অনেক ছোট ছোট বাঁক রয়েছে পরের অধ্যায়গুলোতে যাবার জন্য। নিন্দুকদের দেখা তুমি সবসময় পাবে, তোমার জীবনের সবগুলো অধ্যায়ে, যে কোন বয়সে।

সবার মত হতে পারাটা বড্ড সোজা আর ঠুনকো। তুমি হবে তোমার নিজের মত, আর কারো মত নয়। আর সে কারণে তোমাকে আরও বেশি শিখতে হবে, আরও বেশি জানতে হবে, আর এই শেখা আর জানার জন্য কেবলমাত্র প্রচুর বই পড়তে হবে। নিজের চিন্তাশক্তিকে উজ্জীবিত করতে, নিজের ভেতরে নতুন চেতনাবোধের চাষ করতে, পুরো বিশ্বাসের প্রক্রিয়াকে পালটে দিতে, নিজের দুর্বল বোধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আর সেই লড়াইয়ের শক্তিকে মনের ভেতর সঞ্চয় করে রাখতে দরকার দক্ষতা, যা কেবল শেখা আর পড়ার মাধ্যমেই সম্ভব।

যখন সবকিছু তোমার বিপরীতে যাবে তখন এই সবকিছুর বিপরীতে কখনো উদাসীন হবে না। কারণ এই উদাসীনতা, আক্ষেপ, যন্ত্রণা এগুলো বেশ সহজ বরং এই সবকিছুর বিপরীতে উঠে দাঁড়ানোটাই কঠিন, যার জন্য দরকার সাহস ও উদ্যম। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হল তোমার মাঝে এই দুটোর ভেতর অন্তত একটা গুনাবলীর অস্তিত্বও ঠিক সেই বিষণ্ন মুহূর্তে থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা, এই একা উঠে দাঁড়ানোতে তোমাকে কেউ কোনদিন ধন্যবাদ জানাবে না। তাই যখন তুমি একা লড়াই করতে করতে ভেঙ্গে পড়বে, ক্লান্ত হবে তখন কোন এক শরতের বিকেলে কোন এক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ছায়ায় আমাকে খুঁজে পাবে। আমি তোমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করে থাকব কারণ আমি জানি, তুমি এমন একটা কাজ করেছ যেটা সবাই পারে না, আমরা কেউ পারি না, আমরা কেউ পারি নি।
আজকাল প্রায়ই আমার কোন কারণ ছাড়া বিষণ্ন লাগে। বিষণ্ন হবার মত কোন কারণ আজ আর আমি খুঁজে পাই না। বিমর্ষ, অন্ধকারাচ্ছন্ন, নিশ্চুপ শরতের মৌনমুখর মেঘগুলোর হয়ে তাই আজ আমি একাকীত্বের লড়াইয়ে জয়ী হওয়া এই তোমাকে বলছি,

‘তোমায় ধন্যবাদ, কেবলমাত্র তুমিই তা করে দেখিয়েছ, যা আমি-আমরা কেউ কোনদিন শিকল ছিঁড়ে করে উঠতে পারি নি!’

যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙ্গল ঝড়ে

আমার মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে। খুব নিঃশব্দে, কাউকে না জানিয়ে, অথবা কারও জন্যে কোনওভাবে বিরক্তির তৈরি না করে। আমার চলে যেতে ইচ্ছে করে, যেন আমার জন্মই হয় নি অথবা আমার কোন অস্তিত্বই ছিল না। যেন আমি কোন পথ হাঁটি নি, যেন আমি কোনও পায়ের ছাপ রাখি নি কোথাও। যেন আমি লিখি নি কোন গল্প, অথবা গাই নি কোন গান। নিভৃতে, কারও জেনে ফেলার আগেই, মুছে ফেলতে ইচ্ছে করে ভুল করে তৈরি করে ফেলা আমার অ্যাকাউন্ট। মরে যাবার আগে, আমার একটি বারের জন্যে ইচ্ছে করবে না কারও মুখচ্ছবি মনে করে সামান্যতম দুঃখবোধে সিক্ত হ'তে অথবা কারও কণ্ঠধ্বনি শুনে - পৃথিবী আসলে বড্ড ধোঁয়াটে সুন্দর - সেই কথা দ্বিতীয়বারের জন্যে ভাবতে। হোক সে আমার জননী, যার কাছে আমি নিতান্তই নিরুপায় ক্ষমাপ্রার্থী হবো হয়তোবা আমার অসহায়তার জন্যে, অথবা জনক কিংবা আনন্দময় শৈশবের জন্যে সবসময় কৃতজ্ঞ থাকা হারিয়ে ফেলা বন্ধুটি। হয়তো আমার ইচ্ছে করবে না আরেকবার নিজের এই সামান্য সময়ের ভন্ড জীবনটুকুর জন্যে কোন অতৃপ্তিবোধে আচ্ছন্ন হতে। কিন্তু,আমি যেহেতু মফিজ, জয়নুল, ছগিরুল অন্য সবার মতোই খুব স্বাভাবিক, খুব গুডি বয়দের মতোন ম্যাঁদামারা জীবন যাপন করে এসেছি। এবং আমি মহামানব নই, নই সামান্য প্রতিভাবানও। তাই, হয়তো জেগে উঠতে পারে সামান্য লোভ, তুচ্ছ মনের কোন এক কোণে। ইচ্ছে করতেও পারে জীবনকে কখনোই ভালোবাসতে না পারার ব্যর্থতাটুকু নিয়ে আরো কিছু ক্ষণ, কিছু পল অর্থহীন ভাবনা রচনা করার চেষ্টা করতে। হয়তো ইচ্ছে করে বসতে পারে, আরেকবার হেঁটে যেতে চিরচেনা পথ ধরে আমার শৈশবের পাঠশালায়। অয়ন নামের একজন প্রিয়জন কাল মনে করিয়ে দিলো, আমাদের স্কুলের মাঠটা অনেক বড় ছিলো। সেই মনে করিয়ে দেবার সূত্র ধরে কিছু নিউরন উত্তেজিত হয়ে, মনে করার দরকার নেই এরকম স্মৃতিকে, ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে পারে। শেষবারের মতো আমার মনে পড়তে পারে, বয়েস পাঁচে আমি একবার লাঙল দেয়া জমি ধরে দৌড়ুতে গিয়ে উল্টে পড়ে গিয়েছিলাম। পুরো গায়ে ধূলো মেখে বাড়ি গিয়ে মা-কে কী বলবো, এই ভেবে সারা গায়ে থুথু মেখে বসেছিলাম। আমার মনে পড়তে পারে, শৈশবে আমার রাগী মা কখনো মারলে অথবা বকলে আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিতাম মার খাওয়ার আগেই। অথবা শেষবারের মতোন আমার মোটামুটি নির্ভরযোগ্য স্মৃতিশক্তি মনে করে বসতে পারে, কীভাবে ছুড়ে দেয়া ধাতব পাত্রের আঘাতে সহোদরের একটা দাঁতের অংশবিশেষ ভেঙে দিয়েছিলাম - সেই স্মৃতিও। আমি কখনোই ক্ষমা প্রার্থনা করি নি তার কাছে সেই অপরাধের জন্যে। এখনো তার সেই দাঁতটি সেই অবস্থাতেই আছে, যতদূর মনে পড়ে। এইসব ফ্লাশব্যাক আমাকে ভাবাতে পারে, বিরক্ত করতে পারে। তবুও আমার মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে খুব কোনওরকম পিছুটান ছাড়াই। সবকিছুকেই অতিক্রম করে চলে আসলে যে শূন্যতা থাকে, তাকে স্পর্শ করার মতো সাহস যখন হয়ে যায়, তখন মুক্তির প্রত্যাশাই অনেক বড় হয়ে ওঠে। এতোকিছুর পরেও আমি বেঁচে থাকি নির্লজ্জ্বের মতোন। আমিও আরেকজন মফিজ অথবা রহিম-করিম, রাম-যদু-মধু। আপনার অথবা তার মতোন আমিও স্বপ্ন দেখি, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী পাঁচ-ছয় মাসে আমি আরেকটা ডিগ্রী নিজের রিজিউমিতে যোগ করার সুযোগ পাবো। তারপরে পুড়ে যাওয়া অর্থনীতির দুর্যোগের সময়েও হয়তো কর্পোরেটদের দাসত্ব করবো কোথাও। এইভাবে আপনার মতোই আমিও বাঁচি। আগামীকাল অথবা আগামী মাস কিংবা আগামী বছরও হয়তো বেঁচে থাকবো। তবুও এইসব সময় যখন আসে, তখন ভেবে পাই না, আসলে কী করা উচিত। আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে উঠি, আমি তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর হয়ে যাই। আমার কানে বাজে সেই গান আর কান্না - সব যে হয়ে গেল কালো, নিবে গেল দীপের আলো, আকাশ- পানে হাত বাড়ালেম কাহার তরে?

মহাজাগতিক ইতিহাসে আমাদের এপিটাফের গল্প

কোন সন্ধ্যে সন্ধ্যে রাতে রাস্তারা বুঝি অদ্ভুত প্রনয়ে খুন হয়! খুন হয় কতশত খেয়ালের অগোচরে আটকে পড়া দীর্ঘ নি:শ্বাসেরা! ইশ! আমাদের খেয়ালগুলো য...