অদ্ভুত সব জোনাক পোকা সাজায় ঘাসফুল

 
দুপুরটাকে একলা করে যে পাখিটা উড়াল দিল
সেই পাখিটা সকালবেলা হেসেছিল, গেয়েছিল,
আমার কাছে বসে ছিল।

আমি ছিলাম,
পাখি ছিল,
সুখের হাওয়া ঘিরে ছিল।

পাখি তুমি অমন করে উড়াল দিলে
বিকেলটাকে আমার ভীষন
একলা লাগে, একলা লাগে, একলা লাগে।

একটা কবিতা লিখেছো কী গতকাল

তুমি সব বোঝো বা বোঝো না।
আমি কিন্তু সে দলে নই, যেখানে গুণমুগ্ধ নেই।
আমি দূর থেকে দেখে যাই জানার অপেক্ষায় -

তুমি আজকাল
একাকী কাটাকুটি করে যাও খেরোখাতায়।

-একটা কবিতা লিখেছো কী গতকাল ?

সেই ফিঙ্গে পাখিটা

সেই ফিঙ্গে পাখিটা;
আজও লোহার খাঁচায় মাথা ঘষে ।
পৃথিবীটা তার ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসছে, অশ্রুগুলো
শুকিয়ে যাচ্ছে অক্ষিকোটরে ।
ভঙ্গুর কাঠের ওপর ভর দিয়ে শুকনো দানা চিবোতে
থাকে সে, ব্যথাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শূণ্য
খাঁচার ওপাশটায় ।
এইতো সেদিনই।
এক এক করে উড়ে গেছে তার প্রিয় বন্ধুরা;
অতি পরিচিত মুখ। টিয়ে, চড়ুই, ময়না আরও কতজন !
আটকে আছে শুধুই
সেই ফিঙ্গে পাখিটা;
দরজার ছোট্ট ফোঁকর দিয়ে বেরুতে পারেনি।
এইতো সেদিন !
দুই, চার কিংবা ছয় মাস?
লোহার খাঁচায় অনবরত মাথা ঘষে যায় ফিঙ্গে
পাখিটা…
মাথার ওপরে অসীম আকাশ, অতি পরিচিত মুখগুলো
উড়ে বেড়ায়।
অন্তরের সমস্ত কষ্টগুলো চেপে ধরে তীব্র
আকাঙ্ক্ষায় তাকিয়ে থাকে আকাশপানে।
সেই ফিঙ্গে পাখিটা;
মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়ে বেড়ায় আকাশে;
ছোট্ট খাঁচার ভেতর নিজের অজান্তেই মেলে ধরে
জরাজীর্ণ পাখা দুটো….।

সে জানে অবশেষে - কোথাও কেউ নেই !

 
রাত যতই গভীর হয়
আমি দেখি অটোগ্রাফে - কথা হয়।

কোথাও কেউ একাকী হয় জনসমুদ্র পেরিয়ে -
সে জানে অবশেষে - কোথাও কেউ নেই !
নতুন মৃত্তিকায় সবুজ সব রয়ে যায় -

তোর অজস্র বসন্ত বিকেল থেকে, শুধু একটা বিকেলে আমাকে ধার দিস।

 http://i.ytimg.com/vi/o33lFr9ZTE0/maxresdefault.jpg
" তোর অজস্র বসন্ত বিকেল থেকে, শুধু একটা বিকেলে আমাকে ধার দিস।"
ডানা ভাঙ্গা পাখির দল তোমার
আর আমার হারিয়ে যাবার
সাক্ষী !

আমি তো হারিয়ে যাবো ঠিক ই, অজানা অহংকারে ,
মিছে দাম্ভিকতায় আর
অর্থহীন জেদে !

ডানাভাঙ্গা পাখিরা ঠিক ই
মনে রাখবে !

আমি একটা বিষন্ন রাতের
গল্প , যার
তারাগুলো বিষাদের
সুরে কাতর ! বাতাসে গভীর
শুন্যতার ছায়া !

আমি লিখতে বসেছি অতৃপ্ত
আত্বার গল্প সঙ্গী আঁধার আর
মন খারাপ করা রাত !!

বসন্তের স্নিগ্ধ বিকেলের
হাওয়ায় সবুজের আলোড়ন ,
যান্ত্রিক অবয়বে তোর
আগমনে প্রকৃতিতে উচ্ছ্বাস
ছিলনা ! আমার নিস্তব্দ
সাঝবেলায় তখনো হাওয়ার
ছাট লাগেনি !

ধীরে ধীরে মনোজগতে তোর
অদৃশ্য দখলদারি ! আমার
পাখিদের সুর তুই বুঝিস , আমার
বিকেলের রোদ তোর হয়ে যায় ,
আমার নদীর বাকে তোর ছোট্ট
কুটিরে জোছনা বিলাসের
সমস্ত অধিকার তোর ই কেবল !

তারপর একদিন তোর
চোখে আমি অপ্সরী ছায়া দেখতে পাই !
"And There will be
companions with beautiful ,
big , And Lustrous eyes " !

আমার নদীর জল , আমার
বিকেলের হাওয়া , আমার
পাখিদের গান তোকে উপহার
দেই রোজ ! বিনিময়ে পাই তোর
আকাশের মেঘের ছায়া , তোর
স্নিগ্ধ সকাল !

একদিন ঝুম
বৃষ্টি নামলো আমার জানালার
টুকরো আকাশ থেকে ! দু
ফোটা বৃষ্টি জল আমায়
ছুঁয়ে গেল ! তোর
আকাশে তখনো কালো মেঘ !

বিষন্ন আকাশের হুংকার !

পাখিদের ওড়াওড়ি নেই ,
আমি জানিনা তোর আকাশ
কি এখনো থমকে আছে বিষন্নতায় ??

আমার জানালার কান্না বন্ধ
হলে আমি তাকাই তোর আকাশে !

কিন্তু হায,়
আমি দেখতে পাইনা তোর
আকাশ , তোর স্নিগ্ধ সকালের
মায়াবী রোদ ! আমার নদীর
বাকে কুড়েঘরে জমে থাকা অভিমান !

নদীতীরে বসা একটা নিঃসঙ্গ
চিলকে পাঠাই তোর খবর
আনতে , সে চিল আর
ফিরে আসেনা !

আরো চাপা অভিমান
বুকে বাসা বাধে ! তারপর এক
সাঝ বেলায় মৃত্যু এসে ভর
করে আমার ঘুমে ! নিরস
দেহটা পড়ে থাকে , মৃত্যূ হয়
অভিমানী আত্বার !

আমি দেখতে পাই আমার
মুঠোফোনে তোর অজস্র ডাক ,
দেখতে পাই মুঠোফোনে তোর
পাঠানো কথা মালার আগমন !

আমি যে স্পর্শ করার
ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি ,
আমি সে কথামালা জানতে পারিনা ,
পারিনা জানিয়ে দিতে আমার
অভিমানী আবেগ !

খুব
জানতে ইচ্ছে করে কি হয়েছিল
তোর , খুব
জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করে অভিমানী মেঘের
যে মরণ হয়েছে!

একটা চিল
উড়ে যায় তোর বাড়ির দিকে ,
আমি তাকে বলে দেই আমার
হাওয়া হয়ে যাবার খবর !

এ্যালিস! এ্যালিস! তুমি বিম্বিত হয়ো জোছনাতে

আমার যাদুর ঝাঁপি, আমার জমানো পুঁজিপাটা
তাতে আর কিছু নেই, আছে শুধু মায়াবীমুকুর
আমার সে আর্শিটা চিরতরে তোমাকে দিলাম
এ্যালিস! এ্যালিস! তুমি বিম্বিত হয়ো জোছনাতে...


আমাদের যাদুর ঝাঁপিতে এ্যালিস ছিল না –তখনো আমরা ঠাকুমাদের কাছ থেকে ব্রহ্মদত্যি শুনছি, কন্ধকাটা ভূত দেখতে পাচ্ছি রাতের বেলায় কলতলার কাছে সজনে গাছটায়, ব্যাঙ্গমা-ব্যঙ্গমি নিয়ে সন্দহের দোলচালে ভুগছি। আমাদের এ্যালিস ছিল না – আমাদের চারপাশে ছিল মলি, মিঠু, শম্পা, কেয়া সহ ফ্রক পড়ে বড় হতে থাকা আরো অনেকে। সব সমতল ছিল তখনো, প্রায় সমতল ছিল যখন ওরা আমাদের সাথে কুমীর ডাঙা খেলা ছেড়ে দিল শিব তলায়, মনসার দুয়ারে। আমরা ডাকতে থাকি আর ওদের শরীর খারাপ চলতে থাকে – সেই অদেখা অচেনা শরীর খারাপ আমাদের ধ্বন্দে ফেলে দেয়! স্কুল বন্ধ হয় না সেই শরীর খারাপে – কেউ ডাক্তার বাড়ি যায় না নিয়ে ওদের। আমাদের কুমীর ডাঙা খেলা মৃদু হয়ে আসে প্রথমে – ফিকে হয়ে আসে – আমরা ওদের পরে বড় হই।

আমাদের সবার মায়াবীমুকুর ছিল না কিন্তু মায়াবী পুকুর ছিল অনেকগুলি – মায়াবী কাকে বলে? পুকুরঘাটে পাশের বাড়ির মায়াবৌদি চান করতে যায় দুপুরবেলা, পা ঘসে ধুধুলের ছালে, ফর্সা হয়ে যাওয়া পিঠটা থেকে শাঁখা পড়া হাত সরিয়ে দেয় লিরিলের ফেনা – পুকুরজলে ক্রিকেট বল কুড়াতে আসা ছেলেটার কাছে মায়াবী। কেয়ার ক্লাস নাইনে উঠে প্রথমে লালপাড় শাড়ি মায়াবী – কুমীর ডাঙা খেলে মিঠু যখন বড় বড় শ্বাস নেয়, কানের দুলের ডগার জমে ওঠে ঘাম, মায়াবী – সরস্বতী পূজায় মায়েদের শাড়ি পড়া দল নটা চোদ্দোর ট্রেনের অপেক্ষায়, তাও মায়াবী – হঠাৎ জানলা দিয়ে দেখে ফেলা বাহুমূল আর হাতকাটা জামার দোটানায় – পূবালীও মায়াবী। আমরা বেশির ভাগ ছেলেরাই কোন আরশী বিনিময় করিনি। আরশি বিনিময় করেছিল রসিদ চাচার ছেলে আসগার আমার দিদির সই সুমনার সাথে। আসগার আমাদের ফুটবল ক্যাপ্টেন – সে আমাদের চিঠির বাক্স দেখিয়েছিল – অনেক গন্ধ মাখা চিঠি। কৈশোর পেরিয়ে গেল, যৌবন অনেকটা গড়ালে স্কুল মাষ্টার সুমনার বর রেল ফটকের কাছে আসগারের চায়ের দোকানে মাঝে মাঝে স্টপ দেয় – যখন গেট বন্ধ থাকে। আসগার খুচরো ফেরত দেয় – আমার সেই চিঠির বাক্সে দেখতে পাই, আসগারের জাদুর ঝাঁপি, আমি জানি আসগার আজও তা যত্ন করে রেখে দিয়েছে।

সবাই সুমনার মত ভাগ্যবতী হয় না – ওর বাপ শৈলেন যখন তেমনি এক মায়াবী পুকুর ‘গরাঙ্গে’ তে রাতে দুলে বউয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে গিয়ে ধরা পড়ে, সুমনার তখন বিয়ে হয়ে গেছে। শিবতলায় বিচার বসেছে, আলুথালু শৈলেনের ঝোঁকা মাথার সামনে শৈলেনের এ্যালিস বসে আছে – দুলে বঊ। আরো পরে শরীরের চাহিদার সাথে সম্যক পরিচয় হলে আমরা শৈলেনকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেছি – ঘরে চিররুগ্ন বঊ থাকলে একটু ছাড় দিতে হয়। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উইন-উইন। শৈলেন তার এ্যালিসকে অবশ্যই তার সব জমানো পুঁজিপাটা দেয় নি – তবে দুলে বউয়ের ছেলেটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পরত। এই ঘটনার আরো অনেক পরে ফরেষ্ট গাম্প সিনেমা বানানো হয় – কিছু জিনিস দেশ কালের সীমানা মানে না। গরাঙ্গের পারে ধরা পড়ার সেই রাতে দুলে বঊয়ের ব্লাউজ খোলা পিঠ, কালো সুঠাম হাত, লজ্জা না পাওয়া গ্রীবা – থেকে জোছনা চুঁইয়ে পড়ছিল - শৈলেনের এ্যালিস হচ্ছিল বিম্বিত। এই ঘটনার পরে গ্রামের অনেকে বলতে শুরু করেছিল যা শৈলেন লোকসমাজে মুখ দেখাবে কি করে! আরেক দল তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল যে সেই প্রশ্নটাই অপ্রাসঙ্গিক কারণ শৈলেনের লজ্জা বা চক্ষুলজ্জা নামক বস্তু আছে এ অপবাদ তার পরম শত্রুও দেবে না! আবার যে সিনিয়ররা একটু ফিলসফি সূচক হেঁয়ালি মার্কা কথা বার্তা ছুঁড়ত তারা বলল, লোককে মুখ দেখানো না হয় অন্য কথা, কিন্তু এরপর শৈলেন আয়নায় নিজের মুখ নিজে দেখবে কি করে! হায় – তারা জানত না, শৈলেন নিজের আর্শিটা তার অসংখ্য এ্যালিসের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে কবেই!

আমি জানি, এসব বলার মত এখনও ছোঁয়নি এসে শীত
ঝরেছে যে সব পাতা এখনও তাদের রঙ ধূসরের চিহ্নরহিত
শিকড়ে বাড়িয়ে হাত তারা শুধু জল চেয়েছিল
এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে, এক তিলও
অবসর নেই আর তোর বা আমার – কী করে মেলবো ডানা দখিনা হাওয়ায়
তবু যদি সময়ের থেকে কিছু দূরে গিয়ে আজ একবার বসে থাকা যায়...

সেই সব দিনে আমাদের যারা জড়িয়ে থাকত তারা অনেকেই পুরানো হয়ে গেছে এত ক্ষণে – এমনি সেই বটগাছটাও, যার নিচে ছিল আমাদের গ্রামের শ্মশান। অফুরন্ত সময় হাতে নিয়ে থাকা আমরাও দেরী করে ফেলি – কিছু কথা বলা হয়েছিল – অনেক কথা বলি নি সময় মত। আজ বিশ বছরেও বলা হয় নি ঝন্টুকে যে ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের সাড়ে পাঁচ টাকার হিসাবের গড়মিলের মতানৈক্য বয়ে নিয়ে কথা না বলে থাকার কোন মানে হয় না। আজ আর অবসর নেই, বিশেষত আমারই, আমি সময়ের থেকে কিছু দূরে গিয়ে বসতে চাই – ভাবতে চাই যে শীতের সাথে সাথে ঝড়ে গেছে ক্ষণিকের গড়মিল, অবুঝতা – না ঝরা পাতা গুলিই নিয়ে না হয় আজ বসে থাকি – তুমি, আমি – আমরা!

সময় থাকতে পাতা ঝরা গাছে তলায় আমরা বসতে পারি নি – আমাদের চারিদিকে শুধু চিরহরিৎ - সময়ে ঝরে পড়ার সাথে আমরা ছিলাম অপরিচিত। তবে আমরা অকালে ঝরে যাওয়া দেখেছি – আর তাদের সবারই ঠাঁই হত গরাঙ্গের পাড়ের সেই শ্মশানে – সেই বট গাছের আশাপাশে। তবে মড়া পোড়ানো হত সেই বটগাছ থেকে কিছুটা দূরে, শ্যাওড়া গাছটার তলায়। আর্থিক অবস্থান অনুয়ায়ী গ্রামের কেউ মারা গেলে তার দাহ হত নয় ত্রিবেণী বা আমাদের গ্রামেরই ওই গরাঙ্গের পাড়ের শ্মশানে। আমাদের গ্রামের আত্মহত্যায় অকাল মৃত কেউই ত্রিবেণী পোঁছাতে পারে নি। পুলিশ, পোষ্টমর্টেম এর থেকে দূরে থাকতে চাওয়া পরিবার, অর্থনৈতিক অবস্থান ব্যতিরেকে সেই গরাঙ্গেতেই বিশ্বাস রেখেছিল।

ছোট বেলায় আত্মহত্যার ছাপ আমাদের মনে ঢুকিয়ে দিল রায়েদের গুলু – একদিন দুপুর বেলা মাঠ থেকে সে আর ফিরে এল না। ষষ্ঠী ডাঙার মাঠের একমাত্র শ্যাওড়া গাছের তলায় গুলুদাকে কে যেন পড়ে পড়ে গোঙাতে দ্যাখে – গুলুর হাতের আঙুল গুলি শ্যাওড়া গাছের শিকড় জড়িয়ে ধরেছিল – ফেনা ভরা মুখ জল চেয়ে চেয়ে হয়ত ক্লান্ত। সেই গাছের তলা থেকে রায়দের বাড়ি মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে। দেরী হয়ে গিয়েছিল – আমাদের স্মৃতি বলতে মনে আছে মাটির দুয়ারে গুলুর শরীরে খিঁচুনী আর তার পর সব শান্ত। বৈদ্যডাঙা স্কুল থেকে গুলুর বোন মানা কে ডেকে নিয়ে এল কেউ – মানা তখন সবে প্রস্ফুটিত হচ্ছে নীল পাড় শাড়িতে। তার পর সব শেষ - গুলুর কোন প্রেম ঘটিত ব্যাপার ছিল না – মায়ের সাথে রাগারাগি করে গুলুর আর ফিরল না। জানি না তার পর রায় গিন্নিকে পাড়ার মহিলা মহল পাষাণ বলত কিনা – গরাঙ্গেতে গুলু মিলিয়ে গেল এমন করেই। তখনো আমাদের ওদিকে ধান গাছে দেওয়ার বিষ এন্ড্রোসিল আসে নি – প্রায় নিয়মিত ব্যবহার হওয়া এনডিন্‌ খেয়েই গুলু চলে গেল। যে গ্রামে তখন এন্ড্রোসিল চালু হয়ে গিয়েছিল, তারা গুলুর মরে যাবার খবর শুনে বলল, তোরা এনডিন্‌ খাওয়া পাবলিকও বাঁচাতে পারলি না! তাহলে যদি পাবলিক এন্ড্রোসিল খায় তা হলে কি করবি রে! এই বলে এন্ড্রোসিল খেলে পরে তার থেকে বাঁচানোর রিকভারী স্টেপ গুলো বর্ণিত হত।

আসলে যে ছেলেটা মরে গিয়েছিলো কিছুদিন আগে
জবানবন্দী তার হয় নাই লেখা
বিশ্বাস করেছে সেও দখিনা হাওয়ায়
মেনে নিয়েছিলো, এভাবেও বেঁচে থাকা যায়
প্রতি দিন, অষ্ট প্রহর
এবং রাতের শেষে ভোর, প্রতি দিন নিয়মিত আসে
অটুট বিশ্বাস ছিলো তার – দখিনা বাতাসে
তবুও সে মরেছিলো
মরেছিলো, মরে যেতে হয়
মরে যাওয়া, অর্থাৎ জীবনের অপচয় করেছিলো
সুতরাং হিসেবী ছিলো না বলা চলে
তলে তলে কী যে ভেবেছিলো সে খবর নেওয়া যায় যদি
ধরা যাক, স্বীকারোক্তি, মৃত্যুকালীন।


গুলুর মৃত্যু কালীন স্বীকারোক্তি আমরা পাই নি – আর তা নিয়ে কারো উদ্বেগ ও ছিল না। কিন্তু মেজোদের বাড়ির বরুন যখন রেলে কাটা পড়ে মারা গেল বা আত্মহত্যা করল – গ্রাম তুঙ্গে উঠল আলোচনায়। আর টু বি ফেয়ার গ্রামের পাবলিকের প্রতি, সেই তুঙ্গে ওঠার কারণও ছিল। বরুণই প্রথম ব্যক্তি যে নিমো স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে মারা যায় বা আত্মহত্যা করে। এর আগে অনেকই রেলে কাটা পরে মারা গেছে – এই কাজে নিমো রেলগেট এবং তারো উপরে নিমো আপ প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে বেল গাছের তলা খুবই বিখ্যাত। বরুণ এই দুই জায়গা কোনটাতেই আত্মহত্যা না করায় তার মৃত্যু কালীন বা মৃত্যুর ঠিক আগেকার জবানবন্দীর খোঁজ পেতে মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

নিমো গ্রামে ঘোষ বংশের বেশ আধিপত্য ছিল এক কালে – এবং সেই হিসাবে ঘোষ পাড়ার ও। আমাদের বাড়ির ডান দিকে ছিল ঘোষেদের মধ্যে বড় ভাইয়ের বাড়ি – অর্থাৎ বড় দের বাড়ি। বাঁ দিকে ছিল মেজোদের বাড়ি – আর আমাদের দাদুরা তা হলে হিসাব মত দাঁড়াচ্ছে এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলির মধ্যে ছোট। মেজদের বাড়ির পাবলিক কিছু আপগ্রেডেড ছিল বড়দের বাড়ির থেকে- রণকা কংগ্রেস পিরিওডে বার্নপুরে কাজ পেয়ে চলে যায়। এবং তার পর তার অপর দুই কাকাতো ভাই অরুণ ও বরুণকে ডেকে নেয়। এই অরুণদার ও বরুণদার বার্ণপুর যাত্রা নিমো গ্রাম বাসীর কাছে মেগাস্থিনিসের ভারতে আগমন বা অল-বিরুণির ভারত যাত্রার মতই স্মরণ যোগ্য। কিংবা তার থেকেও বেশী গুরুত্ব পূর্ণ! মেগাস্থিনিসের ভারতে যাওয়া, ভারতের সমাজ বদলাতে পারি নি, বা ইতিহাস। কিন্তু অরুণদা ও বরুণদা বার্নপুর থেকে ফিরে এসে নিমোর সমাজ ও তার পরের ইতিহাসই পালটে দিয়েছিল। ঘোষ বংশ তালিকা অনুযায়ী অরুণ ও বরুণ উভয়েই আমার দাদা হলেও, গ্রামের দিকে থেকে ওরা ছিল আমাদের বাবাদের পরের ব্যাচ! তাই বাবাদের ব্যাচের মতে – অরুণ ও বরুণ ফিরে এসে গ্রামে ইন্ট্রোডিউস করল গাঁজার। এর আগে নিমো তে তেমন একটা গাঁজার প্রচলন ছিল না – ছিল মূলত সিদ্ধি। বাবার মতে নিমোর একটা জেনেরশনকে শেষ করে দিয়েছিল সেই গাঁজা। বাবার সাথে এমনিতে একমত না হলেও, এই বিষয়ে আমি একমত। সময়ের নিয়ম অনুযায়ী নিমো ভারত সেবক সমাজ ক্লাবের ব্যাটন আমাদের বাবাদের ব্যাচের হাত থেকে অরুণ-বরুণ এর হাতে বদল হয়। ক্লাবে ঢুকে পড়ে গাঁজা – মদ – এবং তত সহ আরো অনেক নেশার সামগ্রী।

বরুনদা কে গ্রামের পাবলিক বেশী ট্রেস করত না, কারণ সকালে বাড়ি থেকে মাথা হেঁট করে চলতে শুরু করে নিমো স্টেশনে নিজের দোকানে ঢুকে গাঁজা খেতে শুরু করত – আবার সেই রাতের বেলায় বাড়ি। আর তার সেই দোকানের ব্যবসা যে কত বার পাল্টেছে, সেই হিসাবে করতে গেলে আমার ব্রেনে চাপ পড়ে যাবে। তবে বরুণদার চার্ম ছিল একটা – সেই চার্ম বোঝা যেত গ্রামের থিয়েটর বা যাত্রার সময়। মেন রোলটা বরুনদা করেছে বহুদিন – তার স্পেশালিটি ছিল প্রত্যেক সিনের শেষে ঠিক লাইট নিভে যাবার আগে একটা মারাত্মক ডায়লগ, এবং তত সহ পোজ। আজো ভাবলে অনুভব করি কি প্রবল ভাবে গ্রামের মানুষ সেই দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করত – এই আমিও। একবার নতুন লাইট ম্যান এল যাত্রার সময় – দৃশ্যের শেষ দিকে বরুনদা ডায়াসের দিকে এগুচ্ছে – ডায়াসে উঠে গ্রীবা উঁচু করে একটা হাত মুঠো করে মুখের কাছে নিয়ে এসে, “এই জেল আমার শরীরকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু আমার মন! আমার ভাবনা! চারপাশের মেহনতি মানুষকে ঘিরে আমার চিন্তা - - - ,” গলা চড়ছে বরুণদার, চ্যাটাই এর উপর বসা আমাদের মুখের হাঁ বড় হচ্ছে ক্রমশঃ – যে বৌদিরা তাদের বাচ্চার গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিল, সেই হাত ক্রমশঃ ধীর হয়ে আসছে – বরুণদা “বীজ বুনে দেব -” এই টাইপের কিছু একটা বলে একটু হাঁপ ছাড়ছে, আর সেই নতুন লাইট ম্যান দিয়েছে লাইট অফ করে। ডায়লগ প্রায় শেষ হয়ে এলেও, ডায়লগ শেষে বরুণদা, স্থির হয়ে যে পোজটা দেয় সেটা তখনো বাকি – গ্রামের মানুষ গেল ক্ষেপে, হালকা ক্যালানি লাইট ম্যানকে। গ্রাম্য সমাজে তখনো এবং এখনো হালকা এবং গুরুত্ব বুঝে প্রবল ক্যালানিকেও স্নেহের চোখেই দেখা হয়। সিদ্ধার্থ, জ্যোতি, বুদ্ধ, মমতা কারো আমলেই এই নিয়ে বেশী হইচই হয় নি, “হোক কলোরব” তো নয়ই। এই ভাবে বরুনদা ‘প্রেসটিজ’ ভালোবাসত – কিংবা কে জানে সেই ‘প্রেসটিজ’ এর জন্যই হয়ত আরো এক বছর বেঁচে থাকত সে!

গহন কিছু ইচ্ছে করে -
এক সমুদ্র জংলা ঘাসের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক সমুদ্র অন্ধকারে
ঝলসে নেবো যে সম্পর্ক, তার কি কোন নাম দেওয়া যায় অর্থবহ
খাতায় লিখে?
এক শালিখে আটকে গেছি। অন্যটাকেও দেখতে পাবো খানিক পরে
তেমনটা আর হচ্ছে কোথায়? শিকড় এত আলগা হল - ভালই বোধ হয়
ভরসা রাখা অস্থাবরে... এই বাজারে...



আমরা কেউই জানতাম না বরুনদার গহন কোন ইচ্ছা ছিল কিনা। তাহলে কি যাত্রার সময়ের সেই “প্রেস্টিজ” এর ভিতরেই লুকিয়ে ছিল বরুনদার গহীন ইচ্ছা? বরুণদাকে মাতাল হয়ে মাতলামো করতে কেউ দ্যাখে নি খুব একটা – সবাই জানত ওদের ব্যাচটা গাঁজার উপরেই থাকত। তা সে হেন বরুণ দা কেন যে আত্মহত্যা করতে গেল, আমরা কেউ বুঝতে পারলাম না। অন্য একটা স্কুল অব থটস্‌ বলল যে প্ল্যাটফর্ম কিনারা দিয়ে রাতের বেলা নেশা করে বাড়ি ফেরার সময়, টাল সামলাতে না লাইনে ট্রেনের সামনে পড়ে যায়। কিন্তু এই থিওরী বাজারে টিকল না – নিমোর ছেলে নেশা করে রেল লাইনে পড়ে যাচ্ছে, এর সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের দিকে এটা সবাই জানত। নেশার থিওরী বাজারে ছেড়েছিল অন্যগ্রামের নিন্দুকেরা – যারা দীর্ঘদিন নিমোর মাতাল ছেলেদের সেলফ কনট্রোল দেখে ঈর্ষায় জ্বলত। বরং এর থেকে বাজারে বেশী খেয়েছিল কনস্পেরিসি থিওরীটা।

বরুন, সুবান, অসীম, উৎপল এই গাঁজাখোর দের দলে কি ভাবে যেন জুটে গিয়েছিল সামাদ সাহেবের ছোট ছেলে গুলু। এই গুলুর বউয়ের সাথে নাকি কেউ কোন একটা গোপন আশিকির খবর পেয়েছিল বরুণদার। এবং তার পর হিন্দী সিনেমার প্লট – ব্যাপার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে, পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে বরুণকে নাকি নেশা গ্রস্ত অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল রেল লাইনে। স্বপ্নে পোলাও রাঁধতে গেলে বেশি করে ঘি ঢালতে আর অসুবিধা কি – এবং সেই নিয়ম মেনে কেউ কেউ হালকা ছুঁড়ে দিল যে গুলুদার বউয়ের পেটে নাকি বরুণের বাচ্ছা চলে এসেছিল! কিছু নিমো গ্রাম বাসী খেয়ে গেল – কারণ এতে রয়েছে অবৈধ প্রেম এবং তত সহ চক্রান্তের গল্প। অবৈধ প্রেমে আমাদের গ্রাম কাবু হয় না – কিন্তু সেই প্রেম জনিত মৃত্যু আমাদের সবার কাছেই এক অনভ্যাসের খবর হয়ে এল। কারো কারো কাছে রসালোও। বরুনদা মরেছিল অন্ধকার রাতে – ঝোড়ো হাওয়ার রাতে। যারা অবৈধ প্রেমে সরগরো তারা বলল, আহা গুলুর বউটা কি একটুও কাঁদবে না, একটুও স্বপ্নে দেখবে না তেকে যে ওর পেট করে দিয়েছিল! বরুনদা বিয়ে করে নি – হয়ত এই ভাবেই বরুনদা একটা শালিখেই আটকে গিয়েছিল – জানা নেই। বাজারের উপর ভরসা রাখলে এটা ধরে নিতে হয় যে বরুনদা দ্বিতীয় কোন শালিখের দেখা পায় নি – আর তার সেই এক শালিখের সাথে সম্পর্ক কেও আমরা কোন অর্থবহ নাম দিতে পারি নি -

জানো - ওদিকে অনভ্যাসে আয়নাতে জমে থাকে মরচের দাগ
রুমালে জমেছে সন্দেহ
বুকপকেটের ভাঁজে চক্রান্তের গন্ধ পাই
এমনকি ঝোড়ো হাওয়া
সেও বুঝি থেমে যায় অন্ধকার রাতে
রাতের কথায় মনে হল – স্বপ্ন দেখেছি
আহা, স্বপ্ন দেখেছি কাল রাতে
স্বপ্নের কথা থাক, স্বপ্নেরা থাক অগোচরে
বরং অন্য কথা বলো।

গুলুর বউ স্বপ্ন দেখেছিল কিনা জানি না। অন্য কথা বেশী কিছু নেই – আবার আছেও বটে। আগে মনে হয় বলেছি যে আমাদের গ্রামে আব্দুস সামাদ এই ছিল প্রথম বড় অফিসার। ইষ্টার্ণ রেলে কোণ এক বড় পোষ্টে কাজ করত – শেষ বয়সে জয়শ্রীদি সংক্রান্ত ভিমরতী হবার আগে পর্যন্ত গ্রামের লোক সামাদ কে বেশ সম্মান করত – এবং তার সেই উচ্চ পোষ্ট এবং জীবন যাত্রা থেকেই নাম হয়েছিল সাহেব। এবং আমাদের দেখা গ্রামের মধ্যে সাহেবই প্রথম নিজে মুসলিম হয়েও হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছিল – জ্যেঠিমা ছিলেন ব্রাহ্মণ। তো সামাদ সাহেবের দুই ছেলে – বাতুদা ও গুলুদা দুইজনেই ছোটবেলা থেকে বোর্ডিং স্কুলে মানুষ হয়েছিল দার্জিলিং এর দিকে। দু জনার কেউই বাংলা পড়তে বা লিখতে পারত না – গুলুদা তো আবার ভালো করে বলতেও পারত না বাংলাটা! এহেন গুলুদার বন্ধু কি করে বরুণদা হয়েছিল সেট একটা ভাবার বিষয় – তবে আমাদের গ্রামে এহেন ভাবার বিষয় নিতান্তই প্রচুর ছিল। যারা গাঁজা বিষয়ে পারদর্শী তাঁদের জানার কথা যে, গাঁজা খেলে তার সাথে ভালো খাবার ও দরকার – দুধ, ফল, মাংস এই সব। কথিত আছে যে গুলুদা শুধু বন্ধুদের গাঁজার পয়সাই নয়, খাবার পয়সাও দিত।

যাই হোক সামাদ সাহেবের নেশা ও বিশ্বাস ছিল হাত দেখাতে – রিটায়ার করার পর প্রথম যে কাজটি করে সাহেব সেটা হল মেমারী বাজারে হাত দেখার দোকান খোলা। আর সেই দোকানের নামটিও আবার ঘটনা ক্রমে আমার দেওয়া ছিল – “জীবন দর্শন”, আমার তখন ক্লাস সেভেন। সেই নামটা কোথা থেকে ঝেড়ে ছিলাম সেটা আর মনে পড়ছে না এখন। বাতুদার বিয়ে দেবার সময় সাহেব ঠিক করল পরমা সুন্দরী মেয়ে আনতে হবে বউ করে – বাতুদাকেও পাক্কা সাহেব বাচ্চার মত দেখতে ছিল। তো বেশ খুঁজে পেতে বৌদি এল – সুন্দরী একে বারে যাকে বলে। আমাদের কিশোর হৃদয় পাগল পারা হয়ে গেল। সাহেবের বাড়ি গেলে দক্ষিণ কোনের জানালায় চোখ রেখে দিই আমরা – কামারদের বেচাদা যেমন আমাদের গ্রামে প্রথম লুঙ্গি ছেড়ে প্যান্ট পরে মাঠে যাওয়া শুরু করে, তেমনি বাতুদার বউই গ্রামে বৌদিদের মধ্যে প্রথম ম্যাক্সি পড়া চালু করে। আহা – সকাল বেলা দুহাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করতে করতে খোলা জানালার কাছে এসে দাঁড়ায় বৌদি – সেও মায়াবী।

সুন্দরী বৌমা ঘরে এলেও সাহেবের ঘরে শান্তি এল না – কারণ, বৌমার বাপের বাড়ি ছিল গরীব আর সেই পরিবার ও অনেক বড় – এতো প্রাচুর্য দেখে মাথা ঘুরে গেল বৌদির, এবং তার বাপের বাড়ির লোকেরও – এবং তার পর পুরো কালী ব্যানার্জীর বাংলা সিনেমা। লারনিং ফ্রম ইনসিডেন্ট থেকে সাহেব ঠিক করল গুলুর বিয়ের বেলায় সৌন্দর্য্য হবে সেকেন্ডারী ক্রাইটেরিয়া, প্রাইমারী হবে শিক্ষা এবং তত সহ হস্ত রেখায় মিল। শিক্ষিত মুসলিম মেয়ে আমাদের দিকে ততো কম ছিল না তখনও, কিন্তু ঠিকুজী-কুষ্টী মেলে না কারো! – শেষ পর্যন্ত মমতাজের সাথে গুলুর ঠিকুজী মিলল – এবং বিয়েও হয়ে গেল। মমতাজ কে তেমন একটা দেখতে ভালো নয় – আর কৈশোর শিক্ষা বা কুষ্ঠী নিয়ে বেশী মাথা ঘামাতো না বলে মমতাজ আমাদের রেডারের বাইরেই রয়ে গেল যতদিন পর্যন্ত না বরুনদা মারা যায়। বরুনদার মারা যাওয়ার পর, সেই চক্রান্তের গল্প, সন্দেহের বাতাবরণ আমার কিছু প্রায় মুছে যাওয়া স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।

কোনদিন দেখা হয়ে যাবে
যেমন মেলার ভিড়ে চোখে পড়ে যায় চেনা মুখ, সেইভাবে
ভদ্রতার হাসি, অমায়িক
হয়তো বা মুখোমুখি নয়, বেশ দূরে, তবু ঠিক
পাশাপাশি বসা যেন, কিছু কথা বড় আলগোছে
সময় কত কি মোছে
খাড়াই অন্ধকারে নিষ্প্রভ পাহাড়ের দাগ
খুনসুটি, ভালোবাসা, আদর – সোহাগ
নদীতে জোয়ার ছিলো, এখন ভাঙ্গন।


একদিন আমি আমার আমার ছোট মামা (ছোট মামা আমার প্রায় বন্ধু স্থানীয়) গ্রামের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছি – আমাদের গ্রামে ঢুকতে গেলে প্রথমেই সাহেবের বাড়ি পেরোতে হয়। তা সেই সাহাবের বাড়ি পেরোচ্ছি, হঠাৎ শুনতে পাই দোতলার বারান্দা থেকে একটা মহিলা কন্ঠ, “কি রে চাঁদা, তুই কোথায় এখানে”? (চন্দন থেকে চাঁদা) – মামা অবাক – জানা গেল মমতাজ নাকি মামার কলেজের সহপাঠি ছিল। এবং তার পরই আমার স্মৃতির কোটর থেকে উঠে এল মমতাজকে নিয়ে মামার গল্প। মমতাজ নাকি কলেজে পড়তে পড়তে একটা ছেলে সাথে পালিয়ে গিয়েছিল কিছু দিনের জন্য – বিয়ে হয়েছিল কিনা জানা নেই – তবে কিছু রাত কাটিয়ে আবার বাড়ি ফিরে আসে (বা খুঁজে আনা হয়)। রাত কাটানোটা আমাদের কাছে ইম্পর্টেন্ট ছিল – তাই নিউরোন সেই গল্প ধরে রেখে দিয়েছে অনেক দিন। তাহলে কি বরুণদা সত্যিই? সময় অনেক কিছু মুছে দিয়েছিল – সেই ক্ষণে বারান্দায় না দাঁড়ালে, আমার মমতাজের গল্প জানা হত না - হঠ করে চোখ পড়ে যাওয়াতে মমতাজ ডেকে ছিল পুরানো বন্ধুকে – হয়ত তার মনে ছিল না, সেই ডাক তুলে আনবে এক পুরানো ইতিহাস – সেই সময়ের কথা যখন নদীতে জোয়ার ছিল – আর এখন এই গল্প হয়ত ডেকে আনতে পারে ভাঙন – তবে সেই গল্প আমার স্মৃতি কোণেই থেকে গিয়েছিল – আর কাউকে জানাই নি। সামাদ সাহেবের হাত দেখায় বিশ্বাস ভাঙতে ইচ্ছা করে নি কোন দিন।

অরুনদা মেজোদের বাড়ির ছিল, বরুণদাও মেজোদের বাড়ির – মেজোদের বাড়ির আরো অন্যদের গল্প আছে অনেক – করুণদার বিধবা বিবাহ, সুবান দার জুনিয়ার মোহনবাগানে চান্স পাওয়া এবং তার পর গাঁজাতে নিজেকে নিমজ্জিত করা, বিকুর সাথে ষষ্ঠের শালীর প্রেম, বাপিদার কয়লার আড়ত – বয়সে বড় বউ এবং বাপ অকালে মরে যাবার পর রেলে চাকুরী, প্রশান্তের ছাগলের ব্যবসা – অনেক। যাই হোক এককালে ঘোষেদের বড় দের ই বেশী প্রতিপত্যি ছিল গ্রামের মধ্যে – এমনটাও বলা হয়ে যে এক সময়ে নিমো গ্রামে যেখানেই পা দেওয়া হত, সেটাই নাকি বড় দের জায়গা! যা হয় আর কি – বড়দের বাড়ির কেউই আর পড়াশুনা করল না, বাপের ভাঙিয়েই খেত। কথিত আছে, বড়দের বাড়ির নয়নার (ছেলে – নয়ন যার নাম) যখন বিয়ে হয়, নয়নার বাপ ছাদে উঠে মেয়ে পক্ষকে একটা ৩৬০ ডিগ্রী ভিউ দেখিয়ে বলেছিল যে এই সব জমি আমাদের। বক্তব্য সত্যি – কেবল জালি ছিল এর মধ্যে নয়নার লেখা পড়ার সীমা নির্ধারণ নিয়ে। বড় কর্তা ছেলে বিয়ে দেবার জন্য একটু মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে ছিলেন, যা গীতাতে আইন সিদ্ধ করা আছে। নয়না প্রকৃত পক্ষে কি পাশ গ্রামের লোকের জানা থাকলেও (সেভেন বা এইট – এর বেশী কোন বক্তব্যে ডিভিয়েশন দেখা যায় নি), নয়নার বাপ কি পাশ বলে ছেলেকে প্রেজেন্ট করেছিল, সেই বিষয়ে নানা মত প্রচলন আছে – সবচেয়ে বেশী যেটা খায় তা হল ইংলিশে এম এ। নয়নার শালারা কেউ ডাক্তার, কেউ হাই স্কুল টিচার – শালী প্রকৃত ইংলিশে এম এ। বাসর ঘর থেকেই নাকি গড়মিল টের পাওয়া যায় – ফলতঃ নয়নার শ্বশুর বাড়ির কেউই বিয়ের পর আর নিমো আসে নি কোন দিন। নয়না মাঝে নিমো স্টেশনে চায়ের দোকান দিয়েছিল – যা ইনকাম হত তার সবটাই ইনভেষ্ট করে দিনের শেষে মদ খেয়ে নয়না বাড়ি যেত। দু বার রেলে কাটা পড়তে পড়তে এবং একবার জলে ডুবতে ডুবতে বাঁচার পর নয়নার ছেলে পাপাই সেই দোকান বন্ধ করে দেয় নয়নার ইনকাম আটকানোর জন্য। পাপাই ততদিনে কলকাতার বড় বাজার থেকে মাল এনে মেমারীর দোকানে সাপ্লাই দিতে শুরু করেছে। তবে বড়দের বাড়ির সেই গল্প অন্য কোন সময়ে আমাদের বাড়ির উঠানের পেয়ারা গাছের গল্প হবে – রাস্তাপারের রামচন্দ্রের দিয়ে যাওয়া নতুন খেজুর রসের গল্প – আর সেই গুড়ের সাথে মিশে থাকা কিছু নরম কানের লতির স্মৃতি -

আমাদের নিরালা উঠোনে ঝাঁকড়াচুলের একটাই গাছ
পাগলের মত নির্বাক হিংসে করবে শুধু - কথা ছিল
নতুন গুড়ের ঘ্রাণ ঠোঁট ছুয়ে মিশে যাবে কানের লতিতে
সূর্যাস্তের আগে দীর্ঘ গোধূলি জুড়ে আমাদেরই ছায়া
ক্রমশঃ আবছা হবে আমাদেরই নিভৃত সড়কে।

তোকে খুব মিস করি


তোকে খুব মিস করি

তোর পাগলামি
তোর এস.এম.এস
তোর ফোন,
আমার মন,
আর মনের ভেতর অনুভূতির পাহাড়,
আর তুই সেই পাহাড়ের একটুকরো অনুভূতি ।

অনুভূতিগুলো ক্ষনস্থায়ী হয়,
শুধু অনুভব করা যায়; ছোঁওয়া যায় না
ছোঁওয়া যায় না তোর হাত,
তোর বুক ।

তুই শুধু একটু ভালবাসা,
আর ভালবাসাও ক্ষনস্থায়ী হয় ।

একটু বসি তোর পাশে, বিকেলের আলোতে,
নিরিবিলি, তারপর অন্ধকার
তুই হারিয়ে যাস ।

হঠাৎ তোর সাথে কলেজস্ট্রীট
মানুষের ভিড়,
একটা ব্যাস্ত রাস্তা, ট্রাফিক সিগন্যাল,
তার মাঝে তুই কোথায় উধাও
আর খুঁজে পাই না,
খুঁজতেও চাই নি,
তুইতো এমনই,
তোকে খুঁজে পেতে
অনেক আকাশ ভরিয়ে দিতে পারি ভালবাসায়,
তারপর তুই সবটুকু চুরি করে
আমার আকাশে মেঘ টেনে আড়াল

তুই সত্যি পাগল
ভালবাসতে শিখলি না,
তবু জানিস,
তোকে খুব মিস করি ।

মহাজাগতিক ইতিহাসে আমাদের এপিটাফের গল্প

কোন সন্ধ্যে সন্ধ্যে রাতে রাস্তারা বুঝি অদ্ভুত প্রনয়ে খুন হয়! খুন হয় কতশত খেয়ালের অগোচরে আটকে পড়া দীর্ঘ নি:শ্বাসেরা! ইশ! আমাদের খেয়ালগুলো য...