প্রিয় শহর, আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম

তারপর আমি এই শহরে আবার ফিরে আসি। অনেক দূর পথ পেরিয়ে। ততোদিনে আমি ক্লান্ত। আমার শহর প্রবীণ মহাকায় বৃদ্ধ। আমাকে আলিঙ্গনের জন্যে কোন বাহুল্য করার মতোন সুযোগ তার নেই। আমার শেকড় অবশিষ্ট নেই খুব বেশি। অলস সন্ধ্যেতে আমি এই শহরে ঠাণ্ডা পায়ে হেঁটে যাই, পরিচিত মুখ খুঁজি। ভাবি, হৃদ্যতার বোধে কেউ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলবে, আরে তুই..।
অনুভব করি, আমার স্মৃতিবইয়ের পৃষ্ঠা গুলোতে ততোদিনে অনেক জায়গায় অস্পষ্টতার রেশ বড্ড তীব্র।
 আমার মনে পড়ে যায়, এই শহরে আমি প্রথম সাইকেলে চড়তে শিখেছিলাম, বন্ধুর সাইকেলের ক্যারিয়ার থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছিলাম শহরের মোড়ে। এন্টিবায়োটিক গিলতাম অনেকদিন। 
নির্বিকার ধূলোমাখা বাতাস আমাকে মনে করিয়ে দেয়, এই শহরে আমি জীবনে একবারের জন্যে সিগ্রেট মুখে দিয়ে ভেবেছিলাম, ধুরো এই জিনিষ খায় নাকি মানুষে। প্রথম প্রেমপত্র পেয়েছিলাম কারও কাছে। লিখেছিলামও দুয়েকটা।
আমি হেঁটে চলি। এইসব স্মৃতির রেশ ধরে ডিসেম্বরের কুয়াশা-ভরা অন্ধকারে শহরের মূল সড়কগুলোর সোডিয়াম লাইট আমাকে যেন বিদ্রুপ করে। নির্বাচনের হৈচৈ এ দোকানপাট বন্ধ থাকা সড়কের সড়কবাতিগুলোকে বড্ড বেমানান মনে হয়। আমি ভুলে যাই, আমার বন্ধুদের কেউ একজন হয়তো নব্য টেলেকম বেনিয়াদের সুইচরুমে রাত কাটায় অথবা কারিগরিবিদ্যার পড়াশুনা শেষ করে কী করবে ভেবে পায় না ।
কেউ হয়তো রাজধানীর কোন হাসপাতাল-ক্লিনিকে ক্ষ্যাপ দেয় টানা ৪৮ ঘন্টা। 
আমি ভাবি, আমি তো বড্ড ভালো আছি। হোক না, রাত বারোটায় বাড়ি ফিরি। ফিরে গরম জলের স্নান নিয়ে গরম ঘরে নিরাপদ ঘুমে নিমগ্ন তো হতে পারি।
অথবা আনুষ্ঠানিক বিয়ের জন্যে প্রেমিকার মায়ের কাছে কয়েকটা মাস সময় চেয়ে নেয়া বন্ধুটি, যার কোন চাকুরি নেই, নেই কোন অবলম্বন, তার সময় ফুরিয়ে যাবার গল্প শুনে আমি তাকে সান্ত্বনা দিতে পারি না। আমি তার পাশে বসে থাকি অনেকক্ষণ। যে মেয়েটি একসময়ে আমাকে কথা দিয়েছিলো সে আমার সাথে থাকবে, অথচ আমি তাকে ধরে রাখতে পারি নি নিজের ব্যর্থতায়, তার কাছে শুনি, সেও রোজ দৌড়োয়। রাজধানীতে নতুন স্বপ্নের পেছনে সেও ছুটে যায়।
সেই একই সময়ে আমি কোন অকারণে নিজের শহরে নিঃসঙ্গ হাঁটতে থাকি। আমি বড্ড-চেনা পথে হেঁটে গিয়ে ম্যাচ বাক্সের মতোন শাদা দালান দেখি, শহরের পুকুরগুলো ভরাট করে তৈরি করা ঘিঞ্জি মানববসতি দেখি। নক্ষত্রহীন আকাশ দেখি। আবিষ্কার করি, এ আসলে আমারই ভালোবেসে ফেলা আকাশ। আমি নিজেই বদলে গেছি।
তাই বড্ড অচেনা মনে হয় এই নগর, এই আকাশ, এই জীবন। নগরের নিস্তব্ধতা ও উপেক্ষা আমাকে তীরবিদ্ধ করে যায়।
আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, প্রিয় জীবন, প্রিয় শহর, আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।

আমার আকাশে তোমার ছায়া



বাবুই পাখি কেমন আছ?
উড়তে খুব ভালো লাগে তাই না!!!!
আমিও চাই তুমি উড়ো পাখা মেলে,
তাইতো তোমায় দিলাম আমার মনের বিশাল আকাশ।


উড়তে থাকো যত খুশি,
আমি চেয়ে দেখবো তোমার পাখা মেলে উড়তে থাকা,
আর আমার মনের আকাশে থাকবে তোমারই ছায়া-----

সেই দিন গুলো

আমার এখনো সাঁতার শেখার কথা মনে পড়ে
মনে পড়ে আমার বাবা কীভাবে
 


আমার শরীর শক্ত করে ধরে সাঁতার শেখাতেন।

কখনো একটু হাত ফসকে গেলেই
কেমন ছোট হয়ে যেত তার মুখ।


সেই মুখ এখনো হঠাৎ মনে হলে
কেমন যেন সেই সাঁতার থামিয়ে দাঁড়িয়ে পরার মতন
কোথাও চুপচাপ জড়সড় হয়ে যাই,
কাজের গতি কমে যায় আমার।


আর

 মনে মনে বলতে থাকি
বাবা এইতো আমি তোমার পাশেই আছি.......

সবাই কথা রেখেছে (উল্টো কবিতা)


বাই কথা রেখেছে।
আঠারো বছর কেটে গেলো,
সবাই কথা রেখেছে।

ছেলে বেলায় "উরাধুড়া" ব্যান্ড
বলেছিলো,
পয়লা বৈশাখের দিন
হবে কনসার্ট।

কনসার্টে তারা ঠিকই এসেছিলো,
যেতে পারিনি কেবল আমি।
বরুণার সাথে ছিলো
সেদিন প্রথম ডেটিং।

মামাতো ভাই কুদ্দুস বলেছিলো
"বড় হ গাধা,
তোকে আমি ফায়ার ছবি দেখাতে নিয়ে যাবো"
কুদ্দুস, তুই আমাকে ফায়ার দেখিয়েছিলি।
ভালো কথা!
তবে আমি আজকাল
আরো ডেঞ্জারাস জিনিস দেখি!

একটাও ল্যাপটপ কিনতে পারিনি কখনো
কলেজের বারান্দায় দেখিয়ে দেখিয়ে
ফেসবুকে চ্যাট করছিলো লস্কর বাড়ির ছেলেরা।
ভিখারীর মতো দাঁড়িয়ে দেখিনি।
থাপ্পড় মেরে বলেছি,
কলেজ কি ফেসবুকানোর জায়গা??
তারা আর কোনদিন কলেজে আসেনি
ল্যাপটপ নিয়ে।

সুবর্ণ কঙ্কন পরা ফর্সা তরুণীরা
কত রকম আমোদে হেসেছে।
আমার দিকে তারা ফিরে তাকিয়েছিলো।
মুচকিও হেসেছিলো।
কে জানতো!!

আমার তখন প্যান্টের জিপার খোলা ছিলো!

চোখের সোজা আঙ্গুল রেখে
বরুণা বলেছিলো,
"থাপ্পড় খাবি শয়তান"
বরুণা হয়তো জানতো না,
লবন মরিচ ছাড়া কোন তরকারি আমি খাইনা।
এ জন্যই মনে হয় আমাকে খেতে হয়েছিলো।
আমার বা-গালে এখনো ব্যাথা,
মাঝে মাঝে গালে হাত রাখি।
আর ভাবি--
সবাই কথা রেখেছে।
আঠারো বছর কেটে গেলো,
সবাই কথা রেখেছে।
সবাই কথা রেখেছে।

অন্যমনস্ক পাতার আড়ালে


থাকুক না কিছুটা কালো রং আলোর জোছনায়
কিছুটা মেঘ,
কিছুটা মরচে ধরার আকরিক যন্ত্রনা।

চুপচাপ বসে থাকা আর কিছুটা গভীর জলে
শ্যাওলা ছায়া।

থাকুক না ; অন্যমনস্ক পাতার আড়ালে বাদামী রে...

থরে থরে নেমে আসুক ফোঁটা ফোঁটা সব -
তবুও থাকুক নোনা জল
পৃথিবীর দ্রাঘিমায় -

একটি মৃতপ্রায় নদীর মোহনায় জেগে উঠা চরে
থাকুক না ; কিছুটা বালুতট।

থাকুক না কিছুটা কালো রং আলোর জোছনায়....

যার শেষ নেই

একা বসে আছি অবেলায়।
বাইরে তখন হাসিমাখা সকাল গড়াচ্ছে রোদ মেখে,ভীষন আদুরে লেজওয়ালা কাঠবেড়ালিছুটে এলো বটগাছের তলায়।
ঘাস খুঁটে খুঁটে বের করলোএকটা মাত্র সবুজ মুহুর্তযেখানে তার ভালোবাসা লুকোনো ছিলো।
হঠাৎ কোত্থেকে একঝলক দমকা হাওয়া এসেঘাস-গন্ধমাখা ওর নরম থাবা থেকেছোঁ মেরে নিয়ে গেলো সবুজ মুহুর্ত টুকু।
আরভালোবাসা ছড়িয়ে গেলোহলুদ আদিগন্ত সর্ষেক্ষেতে।একদিনতার আল বেয়ে আমরা হেঁটেছিলাম অনেক্ষন গোধুলির দিকে।
সেই কথা মনে হতেই দেখিদুষ্টু দুষ্টু মুখ করে হাসছে হাওয়াটা, কাঠবেড়ালিটাও।আরঘন ঘাসের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছেহেমন্তের রঙ ধরা একটা হাল্কা সবুজ বটের পাতা।
তাতেই আমার মন কেমন করলো বন্ধু,তোর নাম লেখা।



আমার আকাশ

হঠাৎ একদিন মনে হল
অনেকদিন আকাশ দেখি না;

দেখি না মেঘের লুকোচুরি খেলা।

মেঘহীন আকাশের হলদে সূর্যের দিকে চেয়ে
অনেকদিন চোখ রাঙানো হয় না।

আজ আকাশ দেখলাম,
আমার বহু পরিচিত বন্ধুর দিকে যেন চোখ ফেরানো হল

আকাশটা কেমন যেন
গোমড়া মুখে চেয়ে রইল আমার দিকে।

যেন বলছে, “বহুদিন মনে করনি যে আমায়”।

চকিতে চোখ নামিয়ে নিলাম,
চশমার কাচটা পরিষ্কার করলাম বারকয়েক,
এযে আমার সেই পরিচিত আকাশ নয়।

কেমন যেন বিবর্ণ, বিমর্ষ দেখাচ্ছিল ওকে।

এই অপরিচিত আকাশের দিকে
অপলক দৃষ্টিতে ক্ষণিক তাকিয়ে রইলাম,
একটু দীর্ঘশ্বাস, সামান্য আশাভঙ্গের বেদনা
আর অনেকটা ক্রোধ নিয়ে মাথা নিচু করলাম।

আমি তো এই আকাশকে চিনি না।
কখনও চিনি নি।

মনে পড়ে, পদ্মায় চিত সাতার দিতে দিতে
দেখা আমার সেই পুরনো বন্ধুকে।

অথবা গেণ্ডারিয়া থাকতে
আমার বাসার ছাদে শুয়ে দেখা,

স্বচ্ছ, নীল আকাশকে।
এই বিবর্ণ, বিমর্ষ ধূলিধূসরিত,
কালচে নীল জিনিসটি আমার আকাশ নয়।

কে আমার আকাশকে কেড়ে নিয়েছ,
ফিরিয়ে দাও ওকে, ফিরিয়ে দাও।

মহাজাগতিক ইতিহাসে আমাদের এপিটাফের গল্প

কোন সন্ধ্যে সন্ধ্যে রাতে রাস্তারা বুঝি অদ্ভুত প্রনয়ে খুন হয়! খুন হয় কতশত খেয়ালের অগোচরে আটকে পড়া দীর্ঘ নি:শ্বাসেরা! ইশ! আমাদের খেয়ালগুলো য...