আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো শিশিরে, ঘাসের বুকে, নদীর শরীরে, পদচিহ্ন আঁকা এই পথের ধুলোয় লিখে রেখে যাবো সংসারের হাসি-কান্নার গভীরে; আমার জীবনী আমি গেঁথে দিয়ে যাবো ঝরা বকুলের বিষন্ন মালায়।

17 October 2017

একজোড়া চোখ, যে চোখ কখনোই বাড়ি ফেরেনি বিমুগ্ধ বিষন্নতায়...


এখন আমাদের দু'জনের মাঝখানে দিনগুলো ক্যালেন্ডারের মত আর ঝুলে নেই। এখন আমরা আর ঋতুর কথা বলি না। সর্বদাই আমরা চুপ থাকি। বাতাস ফিসফিস করে আর ঋতু আমাদের তার নিজের গল্প শোনায়। তোমার যুবতীবেলা বাড়ে রোজ মরা নদীটার ধারে, পালঘাট বাওড়ের মাঝে; আমার শুধু সিক্ততা বেড়ে যায় প্রতিরাতে, রূপকথা দিয়ে যায় এক অখন্ডিত অসুখ। আমাদের অস্থিরতার সব টুকিটাকি ছাইরঙা গল্প লিখে যাই ছটফটানির ধূসর দৌড় নিয়ে। এতটা সবুজ মায়া আর স্নেহ খাই তবুও পাঁজরের বিষাদ আমাদের ছাড়ে না।

মাঝে মাঝে আমার খুব ইচ্ছে হয় তোমার সাথে এক বিকেলে হঠাৎ করে দেখা হবে, বৃষ্টি থেমে গেছে সেই কবে সন্ধ্যায়.. এখনো জলের স্পর্শ পাই; জানালার ওপারে কে থাকে ভেজা
চুলের গন্ধ উড়ায়ে দীর্ঘ সময়? আমি হাওয়ার কাছে ডাক পাঠাই।  গান থেমে গেছে সেই কখন ছন্দ পতনে, এখনো বুকের মাঝে কে হাত রাখে?নিরালা নদীর উপর স্পর্শ রাখে মৃদু।

জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবছি। আমার সমস্যার কথা তোমায় কি আমি বলতে পারি? আমি কি বলতে পারি – আমার বাবার স্বপ্ন সফল করার জন্য সারাদিন আমি পথে পথে ঘুরি। মহাপুরুষ হবার সাধনা করি। যখন খুব ক্লান্তি অনভব করি তখন একটি নদীর স্বপ্ন দেখি। যে নদীর জল ছুয়ে ছুয়ে এক জন তরুনি ছুটে চলে যায়। এক বার শুধু থমকে দাড়িয়ে তাকায় আমার দিকে। তার চোখে গভীর মায়া ও গাঢ় বিষাদ। এই তরুনীটি আমার মা।

এই সব কথা তোমায় বলার কোনো অর্থ হয় না। বরং কোনো-কোনো দিন তরঙ্গিনী স্টোর থেকে টেলিফোন করে বলি – তুমি কি এক্ষুনি নীল রঙের একটা শাড়ি পরে তোমাদের ছাদে উঠে কার্নিশ ধরে নিচের দিকে তাকাবে? তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। একটুখানি দাড়াও। আমি তোমাদের বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে হেটে চলে যাব। আমি জানি তুমি আমার কথা বিশ্বাস করো না, তবুও যত্ন করে শাড়ি পরে, চোখে কাজলের ছোয়া লাগিয়ে কার্নিশ ধরে দাড়াও। কিন্তু আমি কখনো যাই না। আমাকে তো আর দশটা ছেলের মত হলে চলবে না। আমাকে হতে হবে অসাধরণ।আমি সারাদিন হাটি। আমার পথ শেষ হয় না। গন্তব্যহীন যে যাত্রা তার কোনো শেষ থাকার তো কথাও নয়।
তবুও আমরা অপেক্ষা করি একজোড়া চোখের জন্য, তাকিয়ে থাকি একজোড়া চোখের দিকে, যে চোখ কখনোই  বাড়ি ফেরেনি বিমুগ্ধ বিষন্নতায়।

16 October 2017

কিছু রূপকথারই গল্পে


লাল চামড়ার ব্যাগে বয়স আর পুরনো শহর নিয়ে ইটের ছায়াপথে কতদিন বলো হাঁটবে তুমি?
ইতিহাসের ঝড়ের পরে শান্ত হয়েছে অনেক পুরণো নিঃশ্বাস,  তারা আজ অন্ধকারে।
পুরানের এক ঝাঁপি ওরা একদিন খুলেছিল এখানেই, এই ফুটপাতের গহীন কষ্ট থেকে এখনও উথলে ওঠে সেই পুরাণ, অপক্ক বকুল আর সোঁদা কাগজের ঘ্রাণ সন্ধ্যার এই রেল, বিজলিবাতি, বাতাবিনেবু ঝাউবাগানে দুলে দুলে হারিয়ে যাওয়া নাটাইছেঁড়া স্বপ্ন সবই তো বাস্প হয়েছে ফিনাইলের ঘ্রাণের সাথে তবু, পায়ের আওয়াজ তোমার বাতাসের ডানায় ভেসে আজো ঠিক থমকে থাকে পুরনো সেই মাঠের শিয়রে।

অথচ সময়ই জানে, কথা আছে, ঢের কথা আছে। ইতিহাসের কালো পাতাগুলো পাক খেয়ে শহর শিয়রে উড়ে গেলো উত্তর আকাশে, আরো একবার আমরা লাল সূর্যটা বুকে মেখে মিছিলে কুজনে একাকার, শুধু দুঃখবিলাসে নিদারুণ কেটে গেল আরো এক দুর্লভ পুরনো প্রহর। সব গান ছেড়ে গেছে, প্রভাত ফেরির গান, বিজয়ের।সব…তোমাদের ল্যাবরেটরিগুলোতে সকাল-সন্ধ্যে কিছুই বোঝা যায়না, কি করে জানবো ভোরাই গাইবার সময় এসেছে? তবু বলি, আর একবার
আর একটা ভোরবেলা দাও আমায়, কথা দিচ্ছি তোমাদের শহরে এনে দেব আশাবরির অমিয়াগান।পিছনে পড়ে ছিল কাতর নদী। কারো কঙ্কালে লেখা থাকে মৃত নদীর নাম, যে যায় সে ফেরেনা। তবুও কোনো কোনো রাতে তৃষিত নদীরা ঘুম চোখে জল চায়, ভুল করে আমিও নদীর মত তৃষিত হই, হাত রাখি অর্পিত চাঁদে। ফোঁটা ফোঁটা জ্যোৎস্নারা নিরুপায় হয়ে কাঁদে, তবুও কেউ মিষ্টি করে গল্প বলে না।

কাঁটাতারের ওপারে তোমার হাসি পেঁজা তুলোর মত উড়ে বেড়ায়, আর আমি আবেগ ভেজা অক্ষরগুলোকে ওখানেই লিখে রাখি। রোদ্দুর থেকে উঠে এসে ছাদে দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা-বিষন্ন এক বিকেল খালি পায়ে ফিরে যায় থমকে যাওয়ার অজুহাতে। ক্লাসে পড়া না পারলে আজও কোনো শাস্তি হয়নি তোমার, তুমি বাড়ছ, বেড়েই চলেছো ...এরপর এতসব বনবাদাড়ের গন্ধ, ঝিঝি ভুল হয়ে গেলেও কেঁদে উঠছোনা আর। তবু মনখারাপের এক চায়ের দোকানে সুর, সুরে আড্ডা, খুশি...টিফিন বাক্স ডাকছে, এসো, কলা কেক পাউরুটি ভাগ করি অবেলায়। আর খুশি ছুঁয়ে দাও ওই হাত নাড়া। ফিরে চাওয়া জানালায় শব্দের দোহাই কোনো অসুখ তোমায় ছোঁবে না এখন।

আমি তো এসেছি দূরের সবুজ থেকে যেখানে তাল আর সুপুরির ভিড়ে সন্ধ্যাজোনাকি ভেজা মাটির গভীরে লালনের ঘ্রাণ আপন অতলে ডুবে সেখানে শুধু উড়তে শেখা... উড়ে উড়ে কেউ রঙধনু হয়, কেউ হয় শঙ্খচিল, কেউ সূর্যের সাথে সাথে নরম সন্ধ্যার পেটে হারিয়ে যায় চিরতরে। এসব উপাখ্যানই ঘুরে ফিরে চোখে পড়ে নির্জিব করে দেয় স্বল্পায়ু চেতন, তৃষ্ণারা জমে জমে পাহাড় হয়, শীতল শরাবের লোভে পুরনো দেরাজ খুলি…মনে মনে বুঝি এইসব স্মৃতির সাগরে পালিয়ে, লুকিয়ে সহজ আয়েশে পার করে দেয়া যায় দু-একটি অতিশয় তুচ্ছ জীবন।

9 October 2017

তোমার হাত বাড়ানো পাঁপড়ি থেকে ঝরে পড়ে খেয়া ঘাট


এমন অনেক দিন গেছে আমি অপেক্ষায় থেকেছি ঝরাপাতার শব্দ শুনবো বলে। পাটগাছের পাতাগুলো থেকে থেকে কেঁপে উঠেছে, ভাঙ্গাচোরা বাড়িটার সামনের বাগানে যেখানে কেয়ারী করা ঘাসের দেখা নেই অনেক বছর, রয়েছে কেবল আগোছালো ঝোপের জটা। ঝরাপাতারা বেঁচে থাকুক হৃদয়ে, বেঁচে থাকুক প্রেমিকের ভালোবাসায়, প্রেমিকার ঠোঁটের রক্তিম লাজে, বেঁচে থাকুক নববধুর ফুলছাপ শাড়ীর ভাঁজে।

নিকট অতীতে যতদূরে যাই, ধীরে ধীরে পালকগুলো খসে পড়েছে শরীর থেকে। মায়া, আচ্ছন্নতা, ভালোলাগা ভালোবাসার বর্ণিল পালকগুলো প্রতি বাঁকে এক এক করে। নদীর কাছে গেলে যে মানুষ ফুরিয়ে যায়, যার হাত জুড়ে কোনো ফুল ফুটে নাই, কোনো পাখি নেই তার ঘুমন্ত চোখের পাতায় জমে না গভীরতা, লাল রাত গলে পড়া সিঁড়ির ওপারে যে দাঁড়িয়ে থাকে তাকে অরণ্য চিনিয়ে লাভ নেই।


মলিন বাতাসে উড়ে যাচ্ছে মন খারাপ করা গাছের তুলো। সারারাত কেঁদেছিলাম একটি পাতার মৃত্যুদন্ড দেখে, আমার সাথে জেগেছিল দুরবর্তি কোনো তারা, চোখে মুখে দমকা বৃষ্টি মেখে। আমার ভেতর শুকন নদীর পাড় ঘেসে বেড়ে উঠেছে সবুজ ক্ষত। ট্রাক এসে বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে উপচে পড়া নিল। তোমার হাত বাড়ানো পাঁপড়ি থেকে ঝরে পড়ে খেয়া ঘাট, মনে হয় ঝোপের আড়ালে মাথা গলিয়ে একটু বসি; কবিতা গুলোকে ছরিয়ে দিই। টুকরো  টুকরো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উড়ুক তারা গ্রাম গঞ্জের মাঠে একলা একলা।
তবুও বলি, ভালো থেকো, আর চেরাপুঞ্জির মেঘ জড়ানো মনের ঝড়গুলিকে ছুঁড়ে দিও কালবৈশাখি নাম দিয়ে কোনো এক গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে, শিতল হবে শিরোনামহীন ভালোবাসা...

3 October 2017

এক "সেদিনের" খোঁজে


আজও মনে পড়ে সেই শ্যামল কিশোরী মুখ। স্মৃতির ধূলো হাতড়ে আজও আমি তুলে আনি সেইসব উজ্জ্বল পাতাবাহার দিন। তার আলতামাখা পায়ে নূপুরের ধ্বনিতে আজও আমি পথ খুঁজি, নতুন পথ। সব কৃত্রিম মগ্নতা আর ভুল অবগাহন শেষে প্রতি পূর্ণিমায় আমি তার উঠোনে গিয়ে ডেকে উঠি মেয়ে বাড়ি আছো?


একটা " সেদিনের " খোঁজে বেরিয়েছিলাম, সেদিনটা কোনো উৎসবের দিন হবেনা, তবুও দিনটা ঝলমলে রঙিন হবে, দিনটায়  দু:খ থাকবেনা বলিনি, কিন্তু দু:খটা ভাগ করে নিজের কাছে রাখার মত শক্তি যেন থাকে।
দিনভর ভালবাসাটা সূর্যের  নরম আলোর মত হবে, একটা আরামের উষ্ণ তা পাবো,কিন্তু
পুড়ে যাবোনা। দিনটাকে কোনো জায়গায় আটকে রাখবোনা, গড়িয়াহাট বা নন্দন বা নদীর পাড় নয়, দিনটায় তুমি থাকলেও সেদিনের দিনযাপন একেবারে তুমি নির্ভর নয়, দিনটা খুব সাধারন হবে, একেবারে আমার সেদিনের মত, কোনো পোশাকি নাম থাকবেনা, একটা নামে যেটা হয়তো দিন শেষে দেবো আমার সেদিনের " সেদিন "।

মাধবী আমাকে যে দিন বলেছে আমাকে অবনীভূষনের মত দেখতে সেদিন থেকেই আমি বদলাতে শুরু করেছি। আমি অন্যরকম হয়ে যাচ্ছি। ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছি। ভালই, যত আমি একা হব - তত আমি মাধবীর কাছাকাছি যাব। অনেক হুল্লোড় করেছি, এখন স্নেহছায়া চাই। ইচ্ছে করে মাধবির চোখের সামনে পা ছড়িয়ে বসে থাকি। মাধবির দৃষ্টি ঝর্ণার জলের মতো। মনে পড়ে, অনেকদিন আগে সাঁওতাল পরগনায় একটা ছোট ঝিরঝিরে ঝরনার সামনে অনেকক্ষন একা বসে ছিলাম। বসেছিলাম রাখাল বালকের মত। হাতে বাঁশী ছিলনা, পরনে জিন্সের প্যান্ট আর মুখে সিগারেট, তবু রাখাল বালকের মতো, একথায় কোনো ভুল নেই। প্রায় তিনঘন্টা বসে ছিলাম চুপ করে, নিজের সাথেও কথা বলিনি, এক লাইন গান গাইনি। আমার স্মরনকালে সেই একমাত্র চুপ করে বসে থাকা। মাধবীর সামনে ওইরকম চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে হয়। চুপ করে বসে থাকলে,একদিন না একদিন আমাকে ঠিকই আমারই মত দেখাবে।।

এক আকাশ স্তব্ধতা


একদিন পাখি আমার কাছে এক দুপুরের রোদ্দুর চাইল, আমি জ্যোৎস্না এনে দিতেই মধ্যরাত ছুঁয়ে দিলো ফিসফিসে হাওয়া।
আমি তো চেয়েছিলাম একলা দুপুর !
পাখি অবাক চোখে বলল "রোদ্দুর আজ জ্যোৎস্নার মত করে আলো দেয়।"
সেই থেকে সমস্ত আকাশ জুড়ে রোদ্দুরের মত জ্যোৎস্না ।  জ্যোৎস্নাও পাখিকে ভেজাতে পারেনা।সন্ধ্যারাতি আজ মানস চক্ষে সাক্ষী হল আরেকটি উপাখ্যানের।
স্রোতস্বনা মুগ্ধ চোখে
পাখি লীন হয়ে যায় ঘন মেঘের মত; আকাশ জুড়ে ।
হলুদ মেঘের মত ছলছল স্তব্ধতা পাখির চোখে
এই ওঠোরে ছুঁয়ে নিলাম সমস্ত মানচিত্র ---
চাঁদ ডুবে গিয়েছিলো; তবু ফকফকে জ্যোৎস্না শ্রাবনে
তারা গুলো মানস চক্ষে সাক্ষী হয়ে রইলো আরেকটি উপাখ্যানের। 

2 October 2017

নির্বাসন



বিষণ্ণতার বইখানা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তুমি চললে তোমার পথে। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার খুঁজে খুঁজে আমি ক্লান্ত, একটা সুখের কবিতা পেলাম না। শেষ হাসির রেখাটুকু অস্তমান সূর্যের সাথে মিলিয়ে ডুব দিলে অতলে, নদীর চৌকাঠে বসে এখন আমি বিবর্ণ পাটাতন দেখি-শুন্য দৃষ্টিতে।

তোমাকে একদিন আমার শূন্যতার গল্প শোনাবো, তোমাকে একদিন শোনাবো আমার জলোচ্ছাস্বের স্বর যখন নির্জীব, নিস্পন্দ বসে থাকি সেই জলোচ্ছাস্বের স্বর আচ্ছন্ন করে আমাকে, তোমাকে একদিন ধুধু তেপান্তরের দৃশ্য দেখাবো যেখানে সারি সারি এপিটাফ, বন্ধুর কবর, ভীষন একঘেয়ে শূন্যতা খাবি খেতে খেতে কেমন গড়িয়ে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে।
তোমাকে একদিন এক রাত্রি নিবিড় অঅলিঙ্গনে জড়িয়ে রাখবো অন্ধকার মুড়ে আমার ভেতরের অন্ধকার, আমার ভেতরের ঘর, আমার ভেতরের খাদ, আমার ভেতরের শূন্যতায় আছড়ে পড়া স্মৃতির ভয়াবহ স্রোত...

সেই কবে আমাদের গ্রামের পুকুরে ফেলে এসেছি হৃৎস্পন্দন , চারটি রক্তজবা ! ঘরে ফিরে বুকে টেনে নিয়েছি ম্রিয়মাণ লেবু-পাতার ঘ্রাণ ! অতঃপর ঘুমের ভেতর করেছি একান্ত আত্মহত্যা , কেউ জানেনা !
কেউ একজন হেঁটে চলে গেলো  পুষ্পবতীর চোখের ভেতর , অতলরাত্রি , জল-দৃশ্য , মায়া-হরিণ
এইসব দেখে শুনে অতঃপর ;  দৃষ্টিছায়ায় - নৈঃশব্দ্যে মিশে যায় অবাধে , অরণ্য ঘুমিয়ে গেলে কোথায় যেন এক অন্ধ পাখি কাঁদে ! হারানো বাঁশীর সুর ভেসে আসে ধীর লয়ে ।
সেই পথ ধরে এগোলেই – এক অনিকেত প্রান্তর , অনির্দিষ্ট থেকে কেবলই শোনা যায় নিঃসঙ্গ পাতাদের মর্মর । কারা গেয়ে চলেছে অচেনা ভাষায় গান ?  অতল জলে একজনের ছায়া ম্লান !
ডুবে যাচ্ছে ক্রমশ সুগভীর থেকে সুগভীর অতলে !

একটু একটু করে আরেকটু অন্যরকম হয়ে যায় সময়। তবুও অনেকটা চলা বাকি থেকে যায়। এই এত দূর থেকে আনমনে ভাবি, পুড়ে যাওয়া মন থেকে কি করে ভাসাস চন্দনের গন্ধ?
এই গন্ধ, আর এই সোঁদা সোঁদা দিন, এই সব আজকাল নতুন।
সেই দিন যেই দিন, ঈশ্বরও নেমে আসেন তোর হাতে হাত রেখে পথে, আমিও ডিঙিয়ে যাই চৌকাঠ।
তবু কেউ জানবেনা, এখন, ঠিক এই সব মূহুর্তেরা বড় বেশি নিঃসঙ্কোচে নিঃসঙ্গ। “একলা হবি বন্ধু?”, ফিসফিস চুপিসাড়ে কান পাতাপাতি খেলার দিন। হাতের মুঠি খুলে গেলো হঠাৎ হাওয়ার টানে। এলোমেলো এক পলকে সব বোঝাবুঝি। আঙুলের আলগা হল ফাঁক। একে একে চলে গেলি তুই, এক পা এক পা করে; এই আজ সকালে কেউ বোঝেনি, কেউ না, আমিও বুঝিনি, তোর শেষ আকার টুকুন মিশে গেলো ছায়াপথে।

দুম করে কোনদিন বুকের বামপাশটা কেমন করে উঠলে বুঝিস,সব গুলিয়ে গেছে চৌতারার  মেলায় সন্ধ্যা আসরে, কেবল আবছা আবছা মুখগুলো অনবরত সুখ সুখ করে নিজের বুকেই খুঁড়ে মরে। বন্ধু চৌতারায় আর দম দিসনে, বুকের ভেতরটা একটা বড্ড চুপ ভর দুপুরের মত লাগে। আমি হয়তবা মরে যাবো, একটা ভরদুপুরে অনন্ত নির্বাসনের অজুহাতে। তোর ভাতের প্লেটে জমা আঙ্গুল আঙ্গুল আঁকে নাইবা রইলাম, তোর চৌতারা আর তবলার কান্নায় ঠিকই মিশে রব রে। একটা গান হবে পাগলা? একটা বাউলের বোবা কান্না হবে?



1 October 2017

এক নদীর গল্প


আজ তোকে এক নদীর গল্প শোনাবো, পদ্মা নয়, যমুনাও নয়, তোকে শোনাবো ইচ্ছেমতির গল্প। সেই গল্প শোনার পর তোর বুকের ঠিক বাম পাশটায় এক সবুজ চিনচিনে ব্যাথা জেগে উঠবে। চোখের সামনে ভেসে উঠবে এক ছোট্ট একরত্তি হাহাকার মেশানো ফাঁকা ঘর। সেই ঘরের জানালা দিয়ে টুপ করে বেরিয়ে পড়বে অপূর্ন স্বপ্নগুলো। বৃষ্টিরা ছেড়ে ছেড়ে যাবে তোর উপত্যকা। অতঃপর একদিন-
মধ্যরাত্রিতে জেগে ওঠবে- এ সমগ্র শহর-  তোমার আর্ত চীৎকারে -ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে  শহরের নিঃস্ব-নীল, বেদনার্ত নীরবতা।

জানি বিচিত্র ফসল ফলে তোমার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে। সাধনার জমিজমা তোমার, তবুও তোমার পুঁজির লোভ, নাও দরদামে হেরে যাও অভিঞ্জ বাজারির কাছে। এইসব দরদাম, হারজিত ভুলে যাওয়া সহজ, তবু মৌসুমী শেষে জৈষ্ঠের শূন্য মাঠ দেখে  যদি ভর করে পুরোনো দিনের কোনো আবেগ, যদি পুরো আকাশ কালো হয় মেঘে মেঘে জানি, ভীষন কান্না পাবে তোমার, তুমি কাঁদবে।
মৌসুম শেষে বিদেশী পাখির মতোন স্বপ্নরা উড়ে উড়ে গেলে মনের সীমান্তের ওপারে, মৌসুম ফিরে আসবে, পাখিরাও আসবে আবার ফিরে মুখরিত হয়ে উঠবে অরণ্য ধীরে ধীরে, ফিরে আসবে সবই, দোয়েলের শীষ, পাখির গান;  শুধু আসবে না ফিরে তেজোদীপ্ত সেই হারানো যৌবন।
একদিন পালিয়ে যাবো শহরের কড়া রোদ থেকে , অবিরত শোরগোল বন্ধ ঘরের গুমোট গন্ধ থেকে , পালিয়ে যাব দুঃস্বপ্ন দেখানো অন্ধকার থেকে ....

একদিন হটাত করেই দেখবি  তোর বন্ধুতা, ওর ভালবাসা ছিঁড়ে টুকরো করে নিরুদ্দেশ হয়ে যাব,  কত গল্প বাকি থাকতেই  আসর ভেঙ্গে উঠে চলে আসবো...  হয়ত পথ চলতে চলতে  ধরে থাকা হাতের বাঁধন আলগা করে নেব ,  তোর গান সুনার জন্য আর কান পেতে থাকবনা ।পালিয়ে যাব অনেক অনেক দুরে ....
শ্যাওলা পড়া ইঁটের দেওয়াল আর সেই দেওয়ালে নিয়ত আছড়ে পড়া প্রতিধ্বনি থেকে ।

একটা কথা ছিলো বোধহয় লেখার। ভুলে গেছি। না লিখলাম নাহয়। লিখে কী হবে? সবই সময়ের সাথে সাথে পুরোনো হয়ে যায়, ম্লান হয়ে যায়। সব অনুভূতিরাই এক সময় বিরক্তিকর হয়। আমার এটাও হবে। সময়, শুধু পেরিয়ে যেতে দেয়ার। যাও পেরিয়ে যাও। 

পুনশ্চ অথবা শেষের পর.


প্রিয়তমেষু,

অনেক দিন পর আজ আবার তোমায় লিখতে বসলাম। জানি, কিছুই কিছু নয় এখন আর। তবুও, মাঝে মাঝেই খুব ইচ্ছে করে জানতে। ভালো আছো তো? অথবা, এমনিই জিগেস করার, কি করো?

উত্তরটা অবশ্য না বলে দিলেও টের পাওয়া যেত কোন কোন দিন, ভাবছো আমায়।


এখানে বেশ ঠান্ডা পড়েছে এবার, তোমার ওখানে কেমন জানা হয় না এখন আর। অজানায়, শীত জমা থেকে যায় বুকের ভেতর - বছর জুড়ে ঝরা পাতার সুরে।
তুমি কতটা জানো আমি ঠিক জানি না, আমি নিজেও হয়তো এতটা করে জানতাম না যে, নীল আমার এতটাই প্রিয় - সবকিছুতেই। তোমায় না হারিয়ে পেলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না নীলে বাঁচা, অসময়ে ঠিকই হারিয়ে যেতাম লাল থেকে কালোয়।
ভুল আমারই ছিল, না বলা কথাতেই ভালোবাসা খুঁজে নিয়েছিলাম। কল্পলোকের আকাশ জুড়ে ছিল এই ছোট্ট একটা জীবন একসাথে বুড়ো হবার স্বপ্ন।
জানো, কোন কিছুতেই আমার এতটা দুমড়ে মুচড়ে যায়নি বুকপকেটের একটু নিচে। যতটা ভেঙে চুড়মাড় করে দেয় একটা উপলদ্ধি, আমার সবটুকু মিলেও তোমার যথেষ্ট ছিল না।

কোনদিনই কি মনে পড়ে না? সেইসব মন কেমন করা দিন, নক্ষত্রের রাত আর টুকরো কথকতা?
মানুষ তার না থাকার মাঝেই সবচাইতে বেশি করে থাকে।
তবুও কেন জানি কিছুতেই বুঝতে পারি না, যে কখনও আমার ছিলই না; তাকে হারিয়ে ফেলার অনুভূতি এতটা গভীর তীব্র কিভাবে হয়?


আজকাল আর লিখতে ভালো লাগে না, মনের দরজা খুলে বসা ছোট্ট চিরকুটও না। একটু বেশিই ছেলেমানুষ ছিলাম হয়তো বা, তাই একটু তাড়াহুড়ো করেই বুড়োটে হয়ে যাচ্ছে মন।
তোমাকেও আজকাল আর কিছু বলা হয়ে উঠে না, বলার কিছু না থাকার পরও নিরর্থক কথকতার ভালোলাগা সুর মাখা সময় গুলো কিছুতেই ভালো থাকতে দেয় না। 

বারবার মনে করি ভুলে যাবো, মনের ভুলে মনে থাকে না। ভুলে যাওয়ার কথা ভুলে মনেই থেকে যায় ভুলগুলি; ভালোবাসাগুলি। এই স্মৃতিটুকুই হয়তো সম্বল, আপাত নিরর্থক পথচলার।
সারা রাত্তির অন্ধকারে পথ চাওয়ার পর উদিত সূর্য আলোয় আলোয় ধুয়ে দিতে চায় সবার হৃদয়, নিজেই দিনের শেষে অস্ত যাবে জেনেও। আর বুঝি তার ভালোবাসার সঙ্গী হয়ে বাঁচে আমাদের দুইদিনকার হাসিখুশি বেঁচে থাকার প্রয়াস। আর বাকি সব? নিয়তিই হবে হয়তো বা।
শেষের শুরুও বছর ঘুরে ফিরে আসে তবুও শেষের রেশ আর শেষ হয় না। এই গন্তব্যহীন বয়ে চলাই হয়তো জীবন, তবে তাই হোক।
তুমি অন্তত ভালো থেকো,
অননেক ভালো; ভালোবাসা নিও।

- ইতি
সেই আমি

লাল


তুমি লাল রঙ বড় ভালোবাসো,
তাই দোলের দিন তোমার মুখ
তোমার চুল ভরে ছিল লাল আবির;
সে আবির আমারই মাখানো।

তমার সিঁথিতে জ্বলজ্বল করেছিল
রক্তরঙ্গের সিঁদুর, তার ঔজ্বল্য
সমস্ত আবিরকে নিস্প্রভ করে।

মনে পড়লো তোমাকে দিতে না পারা
কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িগুলো রঙ হারাচ্ছে।।

স্মৃতি যেন একদিন ভুলে যেতে শেখায় আমাদের



প্রতি রাতের মত
চোখ ভেজেনি গত রাতে,
তবে সকালে কেন ফুঁপিয়ে উঠলাম?
বালিশে নুনের দাগ জানে, কাল রাতে
স্বপ্ন, তুমি কতখানি ব্যাথা পেয়েছিলে; কোঁচকানো চাদর জানে
কতখানি ভয় কুঁকড়ে শুয়েছিল তোমার শরীর।

কেউ যেন টের না পায়
আমরা এসেছিলাম এই দেশে,
এই হাওয়া ... ওই নিভে যাওয়া বাতিঘর যেন টের না পায় কেউ;
স্মৃতি যেন একদিন ভুলে যেতে শেখায় আমাদের।

30 September 2017

অলীক ভ্রমন


তুমি জানবেনা কখনই
মাঝরাতে মাঝরাতের সবথেকে নিভু নিভু তারাটাই নেমে আসে আমার জানালায়; আমাকে জানিয়ে দেয় জানালার কাঁচে লেগে থাকা ঝাপসা দুটো হাত হাত বাড়িয়ে যাকে খুঁজে বেড়ায় সে আমি নই, আমি ভুলে যাই আমার অস্তিত্ব, আমি ফিরে যাই নতমুখে ...
আমার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে , আমি পারিনা, আমার কান্না পায় খুব...
আমি ফিরে যাই আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কাছে ; আমি বুঝতে পারি আমার
 শৈশবে আমায় ফিরিয়ে দেবে ওদের দল থেকে, বুঝতে পারি আমার শব্দেরা হারিয়ে যাচ্ছে;
আমি খুঁজে বেড়াই একটা শব্দ  তোর জন্য, আমি ভুলে যাই আমার ঠিকানা, আমার চারপাশ থেকে মুছে যায় প্রিয় শহর, চারিদিকে জেগে উঠে বনভূমি, বিনা প্রশ্নে তোর হাতে আমি রেখে যাই আমার দেখা প্রথম সমুদ্র, নীলআকাশ, আর বর্ষার প্রথম কদম ফুল।

আমার মনে পড়ে অনেকদিন ঠিক মত ঘুম হয়নি, ঘুম ঘুম চোখে ঝাপসা হয়ে আসে বাসস্টপে তোর দাঁড়িয়ে থাকা, ধীরে ধীরে ছাই রঙা বিকেলটা মরে আসে, আমার মনে পড়ে, বড্ড বেশি মনে পড়ে। আমি হাতড়ে বেড়াই সুখি মানুষ হওয়ার উপায়।
রেলিঙের উপর একটা পায়রা ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে বসে আছে। আস্তে তার পিঠ ছুই, সে একটু সরে বসে। উড়ে যায় না। তাকে একটু আদর করি। লোমের ভেতর হাত ডোবাতেই তার নরম হাড় আর পালকের উষ্ণতা আঙ্গুলে লেগে যায়। সেই স্পর্শটা অনেকক্ষন আঙ্গুলে লেগে থাকে। মহাকালে পায়রা ওড়ানোর কথা ভুলতে পারি না, বুঝতে পারি অসুখি হওয়াই আমার নিয়তি।

এক ভয়ের আঙ্গুল আমার হৃৎপিণ্ডে টোকা মারে, নড়ে ওঠে বুকের ভেতর জমে থাকা বাতাস। টের পাই, আমি কাউকেই ভালোবাসিনা। কাউকেই নয়। কেবলমাত্র নিজেকে। আমি কোনোদিন কাউকে ভালোবাসতে পারবোনা; কিভাবে বেঁচে থাকবো আমি...
পৃথিবীতে কত দুর্যোগের বর্ষা নামবে কতবার। কত একা কাটবে দিন। বিকেল কাটলো, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত নামল; বড় বেশি অভিমান জমে ওঠে বুকের ভেতর। টেলিফোন বেজে ওঠে; আমার খুব ইচ্ছে করে, ওপারের কন্ঠস্বরটা তোর হোক।।