মহাজাগতিক ইতিহাসে আমাদের এপিটাফের গল্প

কোন সন্ধ্যে সন্ধ্যে রাতে রাস্তারা বুঝি অদ্ভুত প্রনয়ে খুন হয়! খুন হয় কতশত খেয়ালের অগোচরে আটকে পড়া দীর্ঘ নি:শ্বাসেরা! ইশ! আমাদের খেয়ালগুলো যদি একটা আকাশ রকমের নীলচে না হতো!
 কোন ইট পাথরের মত কষ্ট প্রতিসরন করে বাঁকিয়ে নীলচে না করে দিতো আমাদের শরতের মত অনুভূতিগুলোকে! 

তিস্তানের শব্দের অভাব পড়লে, প্রলুব্ধ রাতের নৈশভোজ মহাজাগতিক ইতিহাস হয়ে থাকে। রাতের তারারাও নিশ্চুপ করে কাঁদতে জানে সবাইকে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য উপহার দিয়ে। অথচ সেইসব তারাগুলো আসলে বহুবছর আগেকার ইতিহাস রকমের পুরনো হয়ে মরে গেছে। ইতিহাস কি আর এক দুইদিনের সস্তা সভ্যতায় তৈরি হয়? ইতিহাস তো এক স্বরচিত এপিটাফের হাইফেন। দুপাশের চার অংকের সংখ্যাটার মাঝে গোটা আস্ত একটা পৃথিবীর গল্প! সেই পৃথিবীর গল্পগুলো এমন করে সুখ সুখ অনুভূতি কিভাবে দিতে পারে?

আমাদের জ্যোৎস্নাবেলায় আমরা কত অদ্ভুতরকম উপায়েই না মরে যাই! মৃয়মান আলোতে যখন আমাদের কবিতা গিলে ফেলার কথা তখন আমরা হাজিরা খাতা খুলে উপস্থিতির হিসেব নিকেশ খুঁজে টুজে মরি। অথচ আমাদের সব চুলচেরা অনুপস্থিতির কারনগুলোকে আমাদের আত্মানুসন্ধান খুব সুন্দর করে মিটিয়ে দিতে পারতো!


মহাজাগতিক ইতিহাসে আমাদের এপিটাফের গল্প।

তবুও জীবনের হিসেব মেলে না কিছুতেই

ফরেস্ট গাম্প' থেকে 'হাজার বছর ধরে'; 'অক্টোবর স্কাই' থেকে 'পুতুল নাচের ইতিকথা'; 'রেইন ম্যান' থেকে 'শঙ্খনীল কারাগার' এই বিশেষ সিনেমাগুলোয়, গল্পে, উপন্যাসে কাহিনী, চরিত্র, ঘটনাপ্রবাহ সব কিছু পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের মনে যেটা গেঁথে যায় তা হল 'জীবনবোধ'।

সিনেমার কোন দৃশ্য নয়, গল্পের কোন অংশ নয়, বরং পুরোটা শেষ করার পর মানুষ কিছুক্ষণ চুপ হয়ে যায়, এক মুহুর্ত তার মনে কিছু আসে না; জাগতিক প্রাপ্তি শুন্য মনে হয়, সবশেষে মনে আসে, জীবন কি? সম্ভবত এই প্রশ্নটাই জীবনবোধ।

এই অনুভূতি সবার মধ্যে এক, সমাজের উঁচু-নিচু তলার লোক, কবি থেকে সৈনিক সবার জন্য সমান। হাজার বছর ধরে'র শেষ পৃষ্ঠায় অথবা ফরেস্ট এর সে ডায়ালগ, "হোয়াই ডোন্ট ইউ লাভ মি জেনি? আই এম নট এ স্মার্ট ম্যান, বাট আই নো হোয়াট লাভ ইজ" মানুষকে একই ভাবে কষ্ট দেবে।

মানুষ কষ্টকে ঘৃণা করে, আবার কষ্ট পেতেই ভালোবাসে বিভিন্ন ভাবে, সম্ভবত জীবনের বড় সময় এই দু:খের সাথে মানিয়ে চলতে হয় বলে। ট্র‍্যাজিডিগুলোই মহাকাব্য হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছে, আর সবার মধ্যেই দু:খ ব্যাপারটা প্রবল।

মানুষ তাই চাঁদ দেখে, আর রাত দেখে চুপ হয়ে যায়। সবচেয়ে সফল মানুষের মধ্যেও এক একসময় সব অর্থহীন লাগে, মনে হয় জীবনের কোন মানে নেই।

আমাদের পৃথিবীটা প্রতিদিন পালটে যাচ্ছে, আশেপাশের মানুষ থেকে সমাজ বাদ যায়নি কিছুই। কিন্তু সেই চার হাজার বছর আগে পিরামিডের পাথর বয়ে নেওয়া শ্রমিক থেকে পাঁচ প্রজন্ম পদ্মায় নৌকা বেয়ে চলা মাঝি; সবাই একই ভাবে কষ্ট পায়। বৃষ্টি দেখে সবাই একইভাবে উল্লসিত হয়। অনুভূতি ঠিকঠাক আছে, পালটে যাচ্ছে মানুষ।

একটা ঠিকানা, কিছু অর্থের জন্য সবাই দৌড়ায়, পরিবার পরিবারকে ভুলে যায়, মানুষ মানুষকে ভুলে যায়। তবুও চৌরাস্তার মোড়ে বিভ্রান্ত পথিকের মত হঠাৎ তারা জীবন নিয়ে বিভ্রান্ত হয়। আধুনিকতার গেঁড়াকলে সব মানুষ এক একটা ক্যালকুলেটর হয়ে উঠেছে ঠিকই, তবুও জীবনের হিসেব মেলেনা কিছুতেই...

চুপচাপ অস্তিত্বের বিকেলগুলো

এক টুকরো বিকেলের গায়ে লেপটে থাকা কবিতার বই, তোমার মলাটে রেখে দিলাম ঘাসের ডগার মত দুটো ভালোবাসা। তুমি সহস্র বছরের ইতিহাসে রেখে দিও আমার চুপচাপ অস্তিত্বের বিকেলগুলো।।

কবিতাঃ আমি বেঁচে আছি

মনে পড়ে অপরাজিতা? 
সেই তালতলার বনে কথা দিয়েছিলে 
অভয় দিয়ে বলিছিলে, জোনাকির আলো ফুরোবে
কিংবা নিভে যাবে চাঁদ।
তবু তুমি থাকবে আমার পাশে
হৃদয়ের খুব কাছে, 
চোখের তারা হয়ে। 
*
তুমিই স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলে।
কথা দিয়েছিলে, 
অভাব এলেও ভাবতে হবেনা।
নিয়ম করে ভালবাসা খাব দুজনে। 
আমি অট্টহাসি দিতাম আর তুমি বকতে,
তোমার কি সব মনে আছে অপরাজিতা?
*
তুমি ছিলে বলেই আমি পথ চলেছি,
নিয়ম করে রোদ মেখে 
আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি।
'আমার আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখার খেলা থামেনি
শুধু তুমি চলে যাবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি'

আমি আজো অপেক্ষায় আছি অপরাজিতা।
তোমার দেখানো পথে হেটে হেটে
আমি এখনো লিখে যাই পরবাস্তব কিছু কথা।
কে বলে আমি পাগল হয়ে গেছি? 
অপরাজিতা আসবে বলে 
আমি এখনো অপেক্ষা করি।

কথা

একটা কথা রয়েই গেল, প্রতিদিনই থেকেই যায়।
হাজার কথা হয়, ওই একটা কথা আর বলাই হয় না।
কথায়, আকাশ ও ভরে উপচে যায়।
তার উপর মেঘেদের দিয়ে ঘর বানাই, বৃষ্টিরা উঠানে নেচে বেড়ায়।
আকাশের আয়তন কত? মাপা যায়?
হৃদয়ের কথায় আকাশটা ফুরোয়, তবু কথা ফুরোয় না।
তোমার জন্য একটা না একটা কথা রয়েই যায়।

তিতাস আর আমার হারানো প্রিয় শৈশব

নারায়ণের ঘাটে গিয়েছি কতদিন
তবু আজও মনে হয়, আমি কি দেখেছি
তোমায় মাঝি, হে নারায়ণ, দেখেছি কি
কোনো জন্মে, তিতাস পাড়ে?

কত কৈশোরসন্ধে ও কুমারী সদৃশ ভোর
গোধূলিবিকেল আর
ঘরেফেরা পাখিসন্ধ্যায়
আমি হেঁটেছি, হেঁটে হেঁটে
চলে গেছি তিতাস হিজলছায়া মেখে...

আর অনেক অনেক রাতে সৌরজ্যোৎস্না
মেখেছি তিতাস হাওয়ায় আর গভীর
গভীর শুনেছি দূরগামী দাঁড়িদের
নিশি-জাগার শব্দ, পাখিডানার গান...

তবু, আজ, এই নির্ঘুম, শাহরিক রাতে
মনে হয়, তিতাস
দেখিনি আমি কোনোদিন
দেখিনি তিতাসছায়া, সেই নারায়ণ
মাঝিকে
কখনো দেখিনি আমি এই জন্মে,
দেখেছি কেবল নদীর শব আর রক্ত
আর ধূলিদীর্ণ এক নারায়ণ-মুখ।

যে পথ গেছে সন্ধ্যাতারার পারে…

আমি মাঝেই মাঝেই একটা স্বপ্ন ঘুরে ফিরে দেখি।
স্বপ্নের দৃশ্যপটে হয়ত সামান্য অদল-বদল হয়। কিন্তু মোটের উপর স্বপ্নটা প্রায় একই রকম থাকে।
স্বপ্নটা দেখতে শুরু করলেই চেনা মানুষকে ভীড়ের মাঝে খুঁজে পাবার মতন আনন্দ হয়। কিন্তু একই সাথে কোথাও যেন একটু দুঃখ ফুলের পাপড়ির ওপর জমে থাকা শিশিরের মত টলমল করতে থাকে।
আমার পৌনঃপুনিক স্বপ্নটা খুব সাদামাটা।
আমি দেখি একটা ছোট্ট মেঠো পথ। সময়টা হল বিকেলবেলা। স্বপনে আমি সূর্য দেখিনা কখনোই। বরং দেখি একটা ছোট কুড়ে ঘরের শনের ছাতে ঝিলমিল করতে থাকা স্বর্ণাভ আলো। আলোটা খুব মিঠে মিঠে। বেশ বুঝতে পারি এইটা হয়ত আমার দেশের হেমন্ত কালের কোন বিকেল বেলা। সরু যে পথটা দেখেছিলাম, একটু পরেই দেখি সেইটে একটা বিশাল সবুজ ধানের মাঠের মধ্যে দিয়ে এক ছুটে চলে গেছে দূরে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় যেন একমাথা সবুজ চুলের কারোর মাথার হয়ত সিঁথি এই পথটা। আমার স্বপ্নে আমি এই পথ ধরে হাঁটতে থাকি। কোন কোন দিন, মাঠের ধানের ঘ্রাণটা পর্যন্ত পাই । আমি দেখি-- আমি খালি পায়ে হাঁটছি এই মেঠো পথে। দু'পায়ে অলস মায়ায় জড়িয়ে আছে ধুলো, হঠাৎ আসা একটা দমকা হাওয়ায় পরনের পাঞ্জাবীটা পত পত শব্দ করতে করতে নৌকার পালের মতন ফুলে ফেঁপে উঠতে চায়।
আমি হাঁটতে থাকি--হাঁটতে থাকি--হাঁটতে থাকি---
আমি অলস পায়ে হাঁটি--আমি বুঝতে পারি, আমার এই হাঁটার উদ্দেশ্য কোথাও পৌঁছানো নয়--আমি কোন গন্তব্যে যাচ্ছি না--আমার ফেরার কোন টান নেই--আমার আছে কেবল পথ হাঁটা---দু'পাশে ভীষন সবুজ অবুঝ ধানের ক্ষেত, মাঝে দিয়ে চলে যাওয়া ধুলোময় ছোট্ট পথ---আর সেই পথের অলস পথিক আমি--
স্বপ্নটার এই জায়গাটাতে এসে প্রতিবার কেন জানি চোখটা জলে ভরে আসে। জানিনা কী কারণে একটা অবুঝ শিশুর মত অভিমান হতে থাকে--কোন কারণ ছাড়াই। ছোটবেলার মত অভিমান হয়--যে অভিমানের কোন সুনির্দিষ্ট কারন থাকে না--থাকে শুধু আকাশ সমান উঁচু অভিমান---
স্বপ্নটা এইটুকুই।
যতবার স্বপ্নটা দেখি ততবার ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখেছি বালিশ ভিজে আছে চোখের জলে।
স্বপ্নটার নানান মানে হয়ত করা যায়। কিছু কিছু মানে নিজেও হয়ত বের করেছি। নিজের দেশটা খুব মিস করি বলেই হয়ত এমন একটা খাঁটি দেশজ চিত্র দেখি স্বপ্নে। নিজের ভেতরের মানুষটা, যে আজ এগারো বছরেও 'বাইরে'টাকে আপন করতে শিখল না--হয়ত স্বপ্নে আমার উপর প্রতিশোধ নেয়। এরকম অনেক ব্যাখ্যা দিতে পারি---কিন্তু সেটা করতেও ক্লান্তি লাগে---মনে হতে থাকে, সব কিছুর কেন ব্যাখ্যা থাকতে হবে? থাকুক না কিছু জিনিস আলো-আঁধারির মায়ায়!
স্বপ্নটা কখনো দুই মাসে একবার দেখি, কখনো হয়ত ছ'মাসে একবার---
কিন্তু দেখি।
যদিও জানি স্বপ্নের শেষে চোখের কোনে টলমল করবে অশ্রু, তবুও কেন জানি স্বপ্নটা বার বার দেখার এক ধরনের ইচ্ছা মনের মাঝে নিঃশ্বাস ফেলে। কেন জানি বার বার দেখতে ইচ্ছে করে সেই ধুলোমাখা পথটাকে---বার বার ইচ্ছে করে খালি পায়ে হেঁটে যেতে সেই পথ ধরে, যে পথ গেছে সন্ধ্যাতারার পারে--
হঠাৎ আসা দমকা বাতাসে শ্বাস নিতে নিতে আমি গুনগুন করি--'মন, মন রে আমার--'
এই গানটা আমার সেই স্বপ্নটার জন্যে, সেই পথটার জন্যে---
কথা ও সুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তুই ফেলে এসেছিস কারে

নিবিঢ় বর্ষায় কেঁপে উঠুক প্রিয়তম পাতারা

শুরু হয়ে গেছে বৃষ্টি। ভেজা ভেজা মাটির গন্ধে ম ম করছে বাতাস। হাত চলে যাচ্ছে জানালার বাইরে। আটকে যাচ্ছে চোখ বিস্ময়ে আবার। মেঘের চাষাবাদ, ঘুরে ঘুরে আকাশের রঙ কালো অন্ধকার। আমাদের রাস্তায় জমে থাকা জল আজ পেয়েছে তার পরিচয়। জল তুমি বর্ষার। তোমাকে এই নগরে রইলো আমাদের মেঘবতী স্বাগতম।

বর্ষার সতেজ বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে জুঁই। দোলনচাঁপার দোলায় মাতিয়াছে বন। লেবু পাতার ঘ্রাণে এই উড়ু উড়ু মন। আজ প্রকৃতিতে বহমান রাজ্যের আয়োজন। উপচেপড়া পুকুরে ডুবসাঁতার দেবে পদ্ম, যেন আকুল আবেদন সাড়া দিল আজই প্রথম বর্ষা। বনে ঝুমঝুমিয়ে উঠেছে কেতকীর মেলা। আহা কতই না মধুর এই বরষা।

আজ খুব মনে পড়ছে শৈশবের কথা। আজ ফের পথে পথে ঘুরে একটা ব্যর্থ জীবনের গান গাইবো। আজ সারা গায়ে থাকবে জলের ছিটে ফোঁটার উল্লাশ। মাঠে মাঠে ঘাসের সাথে জলের প্রেম আজ শিহরন জাগাবে আবার। মন থেকে ভেসে আসছে গান। উতলে উঠছে ধোঁয়া। পাতাদের কম্পন, পরস্পরের প্রেম মেতে উঠছে রজনীগন্ধার ডাক। আজ বাড়ি যাবে আমার সাথে একফুল রজনীগন্ধা।

আজ আমরা আবারো রাস্তায় নামবো। মাঠে মাঠে ফুটবল খেলবো।গায়ে কাদা মাখামাখি করে বাড়িতে ফিরবো। এবং ফেরার আগে চায়ের দোকানে চা খাবো। মাটির চুলোতে কাঠালের বিচি পোড়ানো হোক বা না হোক আমরা চিনে বাদামের কথা ভাববো। এবারের বর্ষায় আমরা রাস্তায় রাস্তায় বৃষ্টি উৎসব করবো। 


কোন কোন বারান্দায় অদ্ভুত কোন বালিকা আমাদের খেলা দেখতে আসবে। বৃষ্টিকে ছূঁতে আসবে। কাগজের নৌকাটি ভাসিয়ে আমাদের দেখে লজ্জা পাবে। আমরা থোক থোক বর্ষায় সেইসব জানালার কথা ভাববো।
আর কদম ফূলের জন্য অপেক্ষা করবো।
কিন্ত শহরে কদম ফুলের বড্ড অভাব। কারন কেউ একজনকে গাছটা লাগাতে হবে।

মাটি প্রস্তত হয়ে আছে। টানা দুসপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। চলেন সবাই অন্তত একটা করে গাছ লাগাই। যেকোন গাছ হোক। যে বাড়িতে আপনি থাকেন তার আশেপাশ কোথাও। অন্তত একটা !!

দশবছর পরে আপনি হয়তো এ বাড়িতে থাকবেন না কিন্ত আপনার লাগানো গাছটি থেকে যাবে। আর সেটি যদি কদম গাছ হয় দেখবেন কোন এক কিশোর তার প্রেয়সীর জন্য রাত গভীরে কদম ফুল নিতে এসছে।
আমরা যদি এই বর্ষায় সবাই একটি করে গাছ লাগাই। মহানগরী একদিন সবুজে বুজে ভরে যাবে। শোনা যাবে পাতার সবুজ অভিমান। হয়তো কিছূ বছর সময় লাগবে কিন্ত এমন একদিন আসবে যেদিন যেদিন সবুজের এই আলোড়নের পাশাপাশি পাখির গানেও মুখরিত হবে এই প্রিয় মহানগরী, জলাশয় গুলি সবুজ জলে পূর্ন হয়ে থাকবে। নদীতে হয়তো নাব্যতাও ফিরে আসতে পারে। এক ছায়ানগরীতে পরিনত হবে এ শহর, এ দেশ। তখন কোন এক বালক তার প্রেমপত্র লিখবে। ছুঁড়ে মারবে ভিজে যাওয়া আকাশের দিকে।

একদিন দেখা হয়ে যাবে ঠিক

একদিন দেখা হয়ে যাবে ঠিক –
নিরাকপরা ভাদ্র দুপুরে,
চেনা শহরের গলিপথে ; অথবা
জৌলুসহীন কোন অনাত্মীয় নগরে।
একদিন ঠিক দেখা হবে।
ততদিনে, তোমার মসৃণ ত্বকে আকুঞ্চন
আমার চোখের আলো ক্রমশ ম্লান,
বয়সী খোলসে আটসাঁট দুইজন ; অচিন মানুষ।
কাছাকাছিই দাড়াবো হয়তো –
চিনে নিতে লাগবে খানিকটা সময়,
অতলে চাপা ব্যথার পাথর গড়ালেই উঠবে সুঘ্রান,
স্বপ্নের ফিরবার পথটাও অতো সোজা নয়।
একদিন দেখা হয়ে যাবে ঠিক –
কথা হবে, সামাজিক নিয়মের কাথাফোড়
কে, কি, কোথায় এইসব – তলায় ভুমিক্ষয়।
ফিরবার পর –
বয়সী মানুষের খোলসে হাসফাঁস
প্রাক্তন বালক বালিকা ; চারু ও অমল।
ঈশ্বর ; পৃথিবীর নিয়ম এতো অদ্ভুত এবং বন্ধ্যা
নিস্ফলা টান, আগুনময় জলের বুকে অনির্বান গরল।
তবু, একদিন দেখা হয়ে যাবে ঠিক – নিরাকপরা ভাদ্র দুপুরে।

ঝরা পাতা

১.
সর্বস্ব খুইয়ে গাছ থেকে খসে পড়ল একটি সবুজ পাতা। ঝরা পাতার হাহাকারে কাঁপন ধরলনা কোথাও। এখানে সেখানে বাতাসের ঝাপটায় ছিটকে যেতে যেতে বিবর্ণ আর মলিন হল অবয়ব। একটা দুর্বার সাথে কিছুক্ষণ লেপ্টে থেকে জিরিয়ে নিচ্ছিল বোধহয়। আরেকটা দমকা হাওয়া ছিটকে নিয়ে গেল দৃষ্টিসীমার বাইরে কোথাও।

শতবর্ষী গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে অমীয় দেখছিল প্রকৃতির নিষ্ঠুর হেঁয়ালী। সেও কি এমনি এক ছিন্ন পাতা ? প্রশ্নটি মনে আসতেই চোখের কোনে অনুভব করল ঝর্ণার কলকল ধ্বনি। বুকের ভেতর চেনা সেই ব্যাথাটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অথচ চোখ বুজলেই ফিরে যেতে পারে স্বপ্নরাঙা সোনালী শৈশবে।

২.
মাঠের আলপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। বাতাস আর রোদের মাখামাখিতে সবুজ ফসলের ক্ষেত পার হচ্ছে স্বাপ্নিক ভাবালুতায়। দিগন্ত বিস্তারী সুবজের সমারোহ পেরিয়ে ছায়াঘেরা স্কুলঘরে ওদের স্বপ্নের চাষ। সেখানে সুর করে নামতা শেখার তালে তালে বিভোর হয় মায়াপুরীর রঙিন স্বপ্নে।

লোখাপড়া শিখে গাড়ীঘোড়ায় চড়ার স্বপ্নই শুধু নয়; সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে হাড়-ভাঙ্গা পরিশ্রমের বদলে একটু আরাম আর আয়েশের স্বর্ণালী আগামী যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে!

৩.
হঠাৎ করেই হারিয়ে গেল মধ্যদুপুরের গনগনে উত্তাপ আর শিশুকন্ঠের নানান কলধ্বনি। চারদিক ছেয়ে গেল অশরীরি সাপের বিষাক্ত ছোবলে। নেমে এল আঁধারের রাত সঙ্গে নিয়ে সহজাত বিপন্নবোধ।

উঠোনে অনেক মানুষের হাঁকডাকে ঘুম ভাঙে অমীয়’র। ঘরের দরজা খোলা। মা আগেই বের হয়েছেন। হঠাৎ মায়ের কান্না এল কানে। ‘মা কাঁদছে কেন?’ একটু এগুতেই বাবার নিথর দেহ অবাক করল সদ্য ক্লাশ টু-এ ওঠা বালককে। ‘বাবা কেন এভাবে শুয়ে আছে?’ মাকে স্পর্শ করতেই অমীয়কে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। ডুকরে উঠলেন তীব্র বুকফাটা আর্তনাদে। সেই শোকে রাতের আকাশ থেকে ঝরেছিল কি কোন নক্ষত্র ? বাতাসে কি হয়েছিল শিশুপুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন কানাকানি ? অমীয় জানেনি, জানেনা আজো!

অমীয়, ছোট্ট মনের ছোট্ট বালক, তখনো বুঝেনি শুয়ে থাকা মানুষটি আর কখনো ডাকবেনা তাকে। কখনো আর বাবার কোলে ওঠার বায়না ধরতে পারবেনা। নদীর ভাঙ্গা কূল ধরে একসাথে হেঁটে যাবার দিন ফিরে আসবেনা আর কখনো। গায়ে অনেক ময়লা জমলেও কেউ আর জোর করে গোসল করিয়ে দিবেনা তাকে।

৪.
অমীয় আজ একা। ওর শিক্ষাজীবন গেছে, প্রেম গেছে, স্বপ্ন গেছে। ছিন্ন পাতার মত বাতাসের ঝাপটায় উড়ে বেড়ায় এখানে ওখানে। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃসীম অন্ধকারে চোখের পাতা ভিজায়; আর ভাবে, ‘হায়! জীবন এত দীর্ঘ কেন ? কেন অবেলায় নিভে গেলনা সাধের প্রদীপ!’

ভুবন চিলের কাব্য

সুচীস্মিতা,
আকাশ এখনো নীল,
উঁচু থেকে আরো উঁচু,
কুমারী আকাশ ছুঁতে চায়-
একলা ভুবন চিল!

হাজারো অট্টালিকার ভীড়ে,
একাকী দোয়েল-
নেচে নেচে,
খোঁজে সংগী তাহার!

বহুতল ভবনের এক কোণে,
নিভৃতে, মাথা গুঁজে আত্মমগ্ন-
একাকী পূরুষ!

কোনো এককালে,
অনাঘ্রাতা অঘ্রানে,
কোনো কেউ, 
দিয়েছিলো কথা।

কৈশোর কেটে গেছে,
তারুন্য প্রতীক্ষায়,
যৌবন হাহাকারে,
ফেরেনিতো সে...

মেঘে মেঘে কেটে গেলো বেলা,
একাকী পুরুষ, এক কোণে,
নিমগ্ন, জীবনের খেরো খাতায়।

প্রাপ্য আর প্রাপ্তির হিসাবের গরমিল-
মেলায় গোঁজামিলে।
তবুও হায় মেলেনা তো হিসাব-
মেলেনি যে কখনো, জীবনে জীবন!

কালপুরুষ জেগে থাকে,
সপ্তর্ষি স্বাক্ষী মহাকালের,
নক্ষত্রেরা পোড়ে,
প্রতীক্ষায় দগ্ধ জীবন!

সূচীস্মিতা,
আকাশ এখনো নীল-
সংগী,
আজো খোঁজে ভুবনচিল!

মহাজাগতিক ইতিহাসে আমাদের এপিটাফের গল্প

কোন সন্ধ্যে সন্ধ্যে রাতে রাস্তারা বুঝি অদ্ভুত প্রনয়ে খুন হয়! খুন হয় কতশত খেয়ালের অগোচরে আটকে পড়া দীর্ঘ নি:শ্বাসেরা! ইশ! আমাদের খেয়ালগুলো য...